ঢাকা, , ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

খেলাধুলা

করোনা আবহেই ক্রিকেটে ফিরছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। দীর্ঘ সময় ঘরবন্দি থাকার পর শ্রীলঙ্কা সফরের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে মুশফিক-মুমিনুলরা। তবে বিপত্তি ঘটেছে স্টেডিয়ামের সাপোর্ট স্টাফের করোনা পজিটিভ হওয়ায়। সতর্কতা অবলম্বন করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত অনুশীলন স্থগিত করে শুরু করেছে করোনা পরীক্ষা।

শ্রীলঙ্কা সিরিজকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই অনেক ক্রিকেটার ব্যক্তিগত অনুশীলন শুরু করে দিয়েছেন। তবে মিরপুর শেরে-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে তামিম-মুশফিকদের অনুশীলনে ভাটা পড়েছে স্টেডিয়াম কর্মীর শরীরে করোনা শনাক্ত হওয়ায়।

শ্রীলঙ্কা সফরের আগে পরিকল্পনানুসারে ক্রিকেটারদের তিনবার করোনা টেস্ট করানোর কথা ছিল। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে মুমিনুল-সৌম্যদের মাঠকর্মীর করোনা পজিটিভ হওয়ায় তাৎক্ষনিক সোমবার ক্রিকেটাদের করোনা পরীক্ষা করানো হল।

অপ্রত্যাশিত করোনা পরীক্ষার বিষয়টি বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের কাছে কিছুটা নতুনই বটে। ফলে কিছুটা শঙ্কা ও উৎকণ্ঠা কাজ করছে মাহমুদুল্লাহ-মুশফিকদের মনে।

করোনো পরীক্ষা শেষে জাতীয় দলের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ দোআ চেয়েছেন, যাতে ফলাফল অপ্রত্যাশিত না আসে।

অস্বস্তিতে আছেন জাতীয় দলের আরেক সিনিয়র ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিমের মনেও। মুশফিক বলেছেন, ‘নতুন এক অভিজ্ঞতা হল। আমাদের জন্য দোয়া করবেন সবাই।’

সৌম্য সরকার করোনা পরীক্ষার পর নিজের ছবি ফেসবুক পেজে পোস্ট করে লিখেছেন, ‘করোনা পরীক্ষা শেষ, আশা করছি ফলাফল নেগেটিভ আসবে।’

শ্রীলঙ্কা সফরের জন্য বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের আরও ৩ বার করোনা পরীক্ষা করাবে বিসিব। ক্রিকেটারতের এই পরীক্ষার অভিজ্ঞতা পেতে হবে দফায় দফায়। শ্রীলঙ্কা গিয়েও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দফায় দফায় করোনা পরীক্ষা করা হবে। সেপ্টেম্বরে শ্রীলঙ্কা সফরে যাওয়ার পর অক্টোবর-নভেম্বরে স্বাগতিকদের বিপক্ষে তিনটি টেস্ট খেলবে টাইগাররা।

 

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শেষ রাউন্ডেও নৌপুণ্যের দাপট দেখিয়ে জয় তুলে নিয়েছে লিভারপুল। যদিও এক মাস আগেই তাদের শিরোপা নিশ্চিত হয়েছিল। ইতিহাসে এক মৌসুমে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পয়েন্ট নিয়ে আসর শেষ করলো চ্যাম্পিয়ন লিভারপুল। দলটির পয়েন্ট ৯৯, অল্পের জন্য সেঞ্চুরি মিস করেছে।

রোববার রাতে প্রিমিয়ার লিগের শেষ রাউন্ডে নিউক্যাসল ইউনাইটেডের বিপক্ষে ৩-১ গোলের জয় তুলে নেয় ইয়ুর্গেন ক্লপের দল। যদিও ডোয়াইট গেইলের গোলে প্রথম মিনিটেই পিছিয়ে পড়েছিল লিভারপুল। তারপর ভার্জিল ফন ডিইক, ডিভক ওরিগি ও সাদিও মানের গোলে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে লিভারপুল।

ম্যাচের ২৭ সেকেন্ডের মাথায় আচমকা গোল খেয়ে বসে লিভারপুল। ইংলিশ ফরোয়ার্ড ডোয়াইট গেইল প্রথমে গোল করে নিউক্যাসলকে এগিয়ে রাখেন। এরপর লিভারপুল বারবার প্রতিপক্ষের রক্ষণে গিয়ে হানা দিতে থাকে। কিন্তু গোলের দেখা পাচ্ছিল না দলটি। তবে ম্যাচের ৩৮তম মিনিটে প্রথম গোলের দেখা পায় লিভারপুল। ফন ডাইকের গোলে ম্যাচে সমতায় ফেরে ইয়ুর্গেন ক্লপের দল। ১-১ গোলের সমতায় রেখে দুই দল বিরতিতে যায়।

দ্বিতীয়ার্থে মাঠে ফিরে আক্রমণ শানাতে থাকে লিভারপুল। ম্যাচের ৫৯তম মিনিটে দলকে এগিয়ে নেন ওরিগি। ডি-বক্সের বাইরে থেকে জোরালো শটে ঠিকানা খুঁজে নেন এই বেলজিয়ান ফরোয়ার্ড। এর কিছুক্ষণ পর একসঙ্গে বদলি নামেন সালাহ, মানে ও ফিরমিনো। তখন দলের গতি আরও বেড়ে যায়। তবে গোল পাচ্ছিলেন না তারা। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে গোল পান মানে। ম্যাচের ৮৯তম মিনিটে ব্যবধান ৩-১ করে ফেলেন তিনি।

এই জয়ে ৩৮ ম্যাচে ৩২ জয় ও ৩ ড্রয়ে  ৯৯ পয়েন্ট নিয়ে আসর শেষ করলো দলটি। এক মৌসুমে লিভারপুলের চেয়ে বেশি পয়েন্ট নিয়ে আসর শেষ করার কীর্তি রয়েছে ম্যানচেস্টার সিটির। তারা দুই মৌসুম আগে পয়েন্টের সেঞ্চুরি পেয়েছিল।

এই মওসুমে ম্যানচেস্টার সিটি ৮১ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে থেকে আসর শেষ করল। শেষ দিনে তারা নরিচ সিটিকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে। দলটির পক্ষে জোড়া গোল করেন কেভিন ডি ব্রুইন। একটি করে গোল গ্যাব্রিয়েল জেসুস, রাহিম স্টার্লিং ও রিয়াদ মাহরেজ।

লিভারপুলের চ্যাম্পিয়ন হওয়া আর ম্যানসিটির রানার্সআপ হওয়া নির্ধারণ হয়ে গিয়েছিল আগেই। শেষ দিনে এই দুই দলের পরের দুই স্থানে থেকে কোন দুই দল চ্যাম্পিয়ন্স লিগ নিশ্চিত করে সে রোমাঞ্চ ছিল। সেখানে ৬৬ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। চেলসির পয়েন্টও সমান ৬৬, তবে গোল ব্যবধানে পিছিয়ে চার নম্বর তারা। অবনমিত হয়ে গেছে বোর্নমাউথ, ওয়াটফোর্ড ও নরউইচ সিটি। 

অভিষেকেই ক্রিকেটবিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের হাসি মুখের ঘাতক মোস্তাফিজুর রহমান। এরপর প্রতিবেশী ভারতের আইপিএলে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে দুর্দান্ত পারফরমেন্স। হন সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়। সুসময়টা যেন পলকেই শেষ হয়ে যায়। তারপরই ইনজুরিতে পড়েন মোস্তাফিজ। অস্ত্রপচার করা হয়। দেয়া হয় বিশ্রাম। এরপর থেকে তার বোলিংয়ে সেই ধার আর দেখা যাচ্ছে না। তবে মোস্তাফিজকে নিয়ে আশাবাদী তার হায়দরাবাদ কোচ টম মুডি।

অস্ট্রেলিয়ার এই জনপ্রিয় কোচ এখন বিপিএলে কাজ করছেন রংপুর রাইডার্সের হয়ে। মোস্তাফিজকে এই দলে না পেলেও শিষ্যের প্রতি অনুরাগ একটুও কমেনি মুডির। সম্প্রতি মোস্তাফিজকে নিয়ে প্রশংসা ঝরেছে তার কণ্ঠে। তার মতে, আইপিএলের মোস্তাফিজের চেয়ে বর্তমানের মোস্তাফিজ আরো পরিণত।

মুডি বলেন, ‘মোস্তাফিজের অপারেশন হয়েছে, এর মধ্যে কাঁধেও একটা অপারেশন হয়েছিল। কাঁধের অপারেশন করানোর পর পুরোপুরি সেরে উঠে ছন্দ ফিরে পেতে একজন পেসারের অনেকটা সময় লেগে যায়। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে আমার মনে হয়েছে, সর্বশেষ আইপিএলের চেয়ে এখন তার গতি অনেকটাই বেড়েছে। এখন সে অনেক স্বাধীনতা নিয়ে বোলিং করতে পারছে। আমি আশা করছি, সে আবারও আগের মতো ফর্মে ফিরতে পারবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘গত দুই বছরে সে যে ধরনের বোলিং করেছে, জাতীয় দলে এবং আইপিএলে নিজের প্রথম মৌসুমে, এতে করে একটা ব্যাপার পরিস্কার যে সে অসাধারণ প্রতিভাবান। শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও এমন বোলার খুব গুরুত্বপূর্ণ।’

রংপুরের দায়িত্ব নিতে বাংলাদেশে পা রেখেছেন মুডি, দক্ষিণ আফ্রিকা সফর ইনজুরির কারণে অপ্রত্যাশিতভাবে শেষ হয়ে যাওয়ায় দেশে ফিরেছেন মোস্তাফিজও। যদিও পরস্পরের সাক্ষাতের সুযোগ হয়নি এখনও।

মুডি জানান, ‘আমার এখনো তার সাথে দেখা হয়নি। তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কেও আমি খুব একটা অবগত নই। তাই কী করলে সে আরো ভালো করবে, এটা বলার জন্য আমি উপযুক্ত কেউ নই।’

এদিকে রংপুর রাইডার্সের অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছেন তরুণ ক্রিকেটাররাও। রংপুরের শীর্ষ চারে খেলার প্রত্যাশা করা কোচ বলেন, ‘তরুণ ক্রিকেটারদের সাথে কাজ করাটা বেশ উপভোগ্য ছিল। পেস এবং স্পিন- দুই বিভাগেই বেশ কিছু প্রতিভাবান ক্রিকেটার রয়েছে। তাদের মধ্যে শেখার আগ্রহও আছে। আজকের অনুশীলনে তাদের সবাইকে একসাথে পেয়েছি, এটা দারুণ ব্যাপার। সবার ব্যাপারে একটা ধারণা পেয়েছি, যেটা আমার জন্য বেশ ভালো হয়েছে।

বিনোদন

দুনিয়াজুড়ে রয়েছে বলিউড সুপারস্টার শাহরুখ খানের কোটি ভক্ত। কতজনের কথা বা নির্দিষ্ট করে মনে রাখতে পারেন এ তারকা। তবে কিছু কিছু ভক্ত তারকাদের হৃদয় ছুঁয়ে যান। তেমনি এক ভক্ত ছিলেন অরুণা পিকে। যিনি শাহরুখের ছিলেন খুব প্রিয়।

গতকাল (মঙ্গলবার) তার মৃত্যুর খবর পেয়ে ভীষণ ব্যথিত কিং খান। ৫৭ বছর বয়সী অরুণা পিকে ছিলেন একজন পাগল শাহরুখ ভক্ত। তাই হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ক্যান্সারের সাথে লড়াই করতে করতে জানিয়েছিলেন শেষ ইচ্ছেটা। সেটি ছিলো শাহরুখকে এক নজর কাছ থেকে দেখা।

আর অন্তর্জালের কল্যাণে সে খবর পৌঁছে যায় শাহরুখের কানে। ভক্তদের জন্য বরাবরই আবেগাক্রান্ত শাহরুখ খান। আর ভক্ত যখন মৃত্যুশয্যায় তাকে দেখতে চান তখন তো আবেগটা আরও বেশি আসেই। তাই শাহরুখও দেরি করেননি। ব্যস্ততায় ছুটে যেতে না পারলেন ভিডিও কলে কথা বলেছিলেন অরুণার সঙ্গে।

আশ্বাসও দিয়েছিলেন ব্যস্ততা কাটিয়ে খুব শিগগিরই দেখতে যাবেন অরুণাকে। কিন্তু সে সুযোগ আর পেলেন না বলিউড বাদশা। কথা দেয়ার তিনদিন পরই মঙ্গলবার সন্ধায় পৃথিবী ত্যাগ করেন অরুণা।

আর সে খবরে বেশ মর্মাহত হয়েছেন শাহরুখ। কেঁদেওছেন তিনি। ব্যক্তিগত টুইটারে তাকে মায়ের মতোই ভালোবাসা জানিয়ে লিখেছেন, মা চলে গেলে সন্তান কতটা অসহায় হয়ে পড়ে তা আমি জানি। তিনি চিরকাল অরুণার পরিবারের পাশে থাকবেন বলেও স্বান্ত্বনা দেন তিনি।

‘অ্যাভেঞ্জার্স’ সিরিজের পরের ছবি অ্যাভেঞ্জার্স: ইনফিনিটি ওয়ার দেখা যাবে আগামী বছরের মে মাসে। অ্যাভেঞ্জার্স ফ্র্যাঞ্চাইজি কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়েছে, অ্যাভেঞ্জার্স ৪ ছবির মধ্য দিয়ে শেষ হবে দীর্ঘ এই সিরিজ। ১০ বছর ধরে ২২টি সিনেমা দিয়ে মার্ভেল–ভক্তদের মনে জায়গা করে নিয়েছে তারা। সেই সূত্র ধরে শেষ ছবি অ্যাভেঞ্জার্স ৪-এ থাকছে নানা চমক। সেসবের একটি হলো, এবারের কিস্তিতে অভিনয় করছেন অস্কারজয়ী অভিনেত্রী ব্রি লারসন।

আগে জানা গিয়েছিল, লারসনকে দেখা যাবে ‘ক্যাপ্টেন মার্ভেল’ চরিত্রে। অবশ্য ক্যাপ্টেন মার্ভেলকে নিয়ে আলাদা একটি সিনেমা বানানোর কথা। সেখানেও ‘ক্যাপ্টেন মার্ভেল’ হিসেবে আছেন ব্রি লারসন। সেই ছবির কাজ চলছে। মুক্তি পাবে ২০১৯ সালের ৮ মার্চ। মার্ভেল–ভক্তদের জন্য এটিও একটি সুখবর।

অ্যাভেঞ্জার্স ফ্র্যাঞ্চাইজির শেষ ছবিটিতে থাকছেন আগের প্রায় সব সুপার হিরো। থাকবেন ‘আয়রন ম্যান’ রবার্ট ডাউনি জুনিয়র, ‘হাল্ক’ মার্ক রাফেলো, ‘লোকি’ টম হিডলস্টোন, ‘থর’ ক্রিস হ্যামসওর্থ, ‘স্পাইডারম্যান’ টম হল্যান্ডসহ অনেকেই। ২০১৯ সালের ৩ মে মুক্তি পাবে অ্যাভেঞ্জার্স ৪

উর্দু কবি কাইফি আজমির গ্রামে ইংরেজরা চাইল নীলচাষ করতে। কাইফির দাদা বুদ্ধি বের করলেন, বীজ ফুটিয়ে জমিতে লাগাবেন। ইংরেজরা তাহলে মনে করবে, এ জমি নিষ্ফলা। আর এভাবে নীলচাষের কবল থেকে মুক্তি পাবে গ্রাম।

দাদা যা ভাবলেন, তা-ই করলেন। তাঁর দেখাদেখি গ্রামবাসীও একই কাজ করলেন। কিন্তু ইংরেজরা একসময় টের পেয়ে গেল। কাইফির দাদার নামে মামলা করল, কিন্তু ইংরেজরা গ্রামে আর নীলচাষ করল না। কাইফি পরে বলেছেন, দাদা জমিতে ইংরেজদের জন্য যে ঘৃণার বীজ বুনেছিলেন, সেটাই কাইফির মনে পরে গাছ হয়ে জন্মেছিল।

বিখ্যাত ভারতীয় গীতিকবি জাভেদ আখতার কাইফি আজমির বয়ানে ঘটনাটি বলছিলেন গতকাল সন্ধ্যায়। ব্লুজ কমিউনিকেশনসের ব্যবস্থাপনায় ‘কাইফি অউর ম্যায়’ অনুষ্ঠানটি হয় রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ কমপ্লেক্স মিলনায়তনে।

কাইফি অউর ম্যায় কবি কাইফি আজমি ও তাঁর স্ত্রী শওকত কাইফির প্রেমগাথা। আছে কাইফি আজমির সংগ্রামী জীবনের কথাও। শওকত কাইফির জীবনী ‘ইয়াদ কি রেহেগুজার’ এবং কাইফি আজমির বিভিন্ন লেখা ও সাক্ষাৎকার থেকে এই মঞ্চ পরিবেশনাটি তৈরি করেছেন জাভেদ আখতার। পরিবেশনায় কাইফির অংশটি পাঠাভিনয় করে দেখান জাভেদ আখতার। আর শওকতের অংশটি করেন কাইফি-শওকতের কন্যা শাবানা আজমি।

কাইফি আজমির সঙ্গে শওকত কাইফির প্রথম সাক্ষাতের ঘটনাটা খুব মজার। শাবানা তাঁর মা শওকতের বয়ানে বললেন ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের কথা। ভাইয়ের সঙ্গে কবিতাপাঠের আসরে গেছেন শওকত। সেখানে কাইফির কবিতা শুনে মুগ্ধ শওকত। নজর আর সরেই না।

এভাবেই শুরু হয় কাইফি-শওকতের প্রেমকাহিনি। দুজনের বিয়েই ঠিক হয়েছিল। তবু কীভাবে ভাইদের বিরুদ্ধে গিয়ে শওকত প্রেম করেছিলেন চালচুলোহীন তরুণ কবি কাইফির সঙ্গে, শওকতের বাবা কীভাবে রাজি হলেন এই বিয়েতে, মুম্বাইয়ে কাইফি-শওকতের দিনগুলো—একে একে এসবের বর্ণনা দিয়ে চলছিলেন জাভেদ-শাবানা।

৫৫ বছরের সংসারের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে কাইফি আজমির রাজনৈতিক জীবনও। স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতে কাইফির সংগ্রামের কথা এল। একসময় স্বাধীনতা এল, কিন্তু রক্তের বন্যা থামল না। একসময় স্বাধীন দেশে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হলো, কাইফি আত্মগোপন করলেন। এ সময় শাবানা এলেন শওকতের গর্ভে। দল এ সন্তান নষ্ট করে দিতে বলল, কিন্তু শওকতের দৃঢ় সিদ্ধান্তে শাবানা জন্ম নিল।

কাইফি চলচ্চিত্রের গান লেখা শুরু করলেন। গান তো হিট হলো, কিন্তু ছবিগুলো ফ্লপ হচ্ছে। সবাই কাইফিকে অপয়া ভাবতে লাগলেন। একদিন চেতন আনন্দ এসে কাইফিকে আবার গান লিখতে বলেন। চেতন আনন্দের হাকিকত ছবিটি হিট হলো। সে ছবির গান লিখলেন কাইফি আজমি, সুর দিলেন মদন মোহন। চেতন, কাইফি ও মদন মিলে একের পর এক হিট ছবি উপহার দিতে লাগলেন।

গজলশিল্পী জসবিন্দর সিং মাঝেমধ্যে গাইলেন কাইফি আজমির লেখা গজল ও গান, ‘ইতনা তো জিন্দেগি’, ‘ঝুকে ঝুকে সি নজর’, ‘ইতনে বাজু ইতনে সার’, ‘তেরে শহর মে’। কাইফির লেখা বলিউড ছবির গানও গাইলেন জসবিন্দর, ‘তুম জো মিল গ্যায়ে হো’ (‘হাসতে জখম’), ‘আব তুমহারে হাওয়ালে ওয়াতন সাথিয়ো’ (‘হাকিকত’), ‘ওয়াক্ত নে কিয়া ক্যায়া হাসি সিতম’ (‘কাগজ কে ফুল’), ‘তুম ইতনা জো মুসকুরা রেহে হো’ (‘আর্থ’)।

দুই ঘণ্টা কখন পেরিয়ে গেল, টের পাওয়া গেল না। জসবিন্দরের গজলের সঙ্গে শাবানা আজমি ও জাভেদ আখতারের পাঠাভিনয় পুরো দুই ঘণ্টা মোহিত করে রাখে দর্শক-শ্রোতাদের। কাইফি আজমি ও শওকত কাইফির প্রেমগাথা শেষ হয়। ‘কাইফি অউর ম্যায়’ (কাইফি আর আমি) নাটকের এ অভিজ্ঞতা, দুই কাইফির সঙ্গে এ দুই ঘণ্টা ছিল অনবদ্য।

সুটিং চলছে আরশিনগর ফিউচার পার্কে একদিন, আরশিনগর ফিউচার পার্কের মনোরম লোকেশনে চলছে সুটিং দীর্ঘ ধারাবাহিক নাটক "আরশিনগর ফিউচার পার্কে একদিন। নাটকটির মূল ভাবনা নাসির উদ্দিন দিদার (চেয়ারম্যান, আরশিনগর ফিউচার পার্ক ও প্রধান উপদেষ্টা, মাতৃছায়া থিয়েটার) নাটকটি রচনা ও পরিচালনা করেছেন শরিফ সারোয়ার, চিএগ্রহণ করছেন শরিফ রানা, নাটকে অভিনয় করছেন মডেল বন্যা চৌধুরী, শফিক, ইউলাদ রানা এবং মাতৃছায়া থিয়েটারের নিয়মিত নাট্যকর্মী বৃন্দ। প্রযোজনা করছে আারশিনগর টিভি। নাটক নিয়ে শরিফ সারোয়ারের সাথে কথা বললে তিনি জানান নাটকটি গল্পটি এমন ভাবে চিত্রিত হচ্ছে দর্শক একটি রোমান্টিক ভালবাসার কাহিনির সাথে সাথে আরশিনগর ফিউচার পার্কের বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন শিল্পকলা দেখতে পারবেন। আশা করছি নাট্য প্রেমীদের অনেক ভাল লাগবে।

অর্থনীতি

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গত বছর আমদানি হওয়া তৈরি পোশাকের ৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ জোগান দিয়েছিল বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সেটি কমে ৬ দশমিক ৪১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রতিযোগী ভিয়েতনাম ও ভারতের বাজার হিস্যা বেড়েছে।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানি গত বছরের চেয়ে কিছুটা কমেছে। গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করে। এটি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১ দশমিক ৯০ শতাংশ কম। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (অটেক্সা) প্রকাশিত পরিসংখ্যান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির হালনাগাদ এসব তথ্য জানা গেছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ৩০৪ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। গত বছর একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৩২৩ কোটি ডলারের পোশাক। সেই হিসাবে এবার রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

রানা প্লাজা ধসের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভালো করতে পারছে না বাংলাদেশ। গত বছর ৫৩০ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল। ২০১৫ সালে রপ্তানি হয়েছিল ৫৪০ ডলারের পোশাক। সেই হিসাবে গত বছর রপ্তানি কমেছিল ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি মাহমুদ হাসান খান গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি উত্থান-পতনের মধ্যে আছে সত্য। তবে বড় ধরনের পতন হবে না বলেই মনে হচ্ছে। আশা করছি, আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে।’

অবশ্য বিজিএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ নাছির প্রথম আলোকে বলেন, ‘বর্তমানে দুটি কারণে আমরা যুক্তরাষ্ট্রে চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছি। চট্টগ্রাম বন্দরের জটিলতার কারণে লিড টাইম বেড়ে গেছে। এ ছাড়া পোশাক খাত নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণার কারণে অনেক ক্রেতা বাংলাদেশ বিমুখ হচ্ছেন।’

নেতিবাচক প্রচারণার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে মোহাম্মদ নাছির বলেন, ‘কিছু শ্রমিক সংগঠন ও এনজিওর প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে “শ্রমিক অধিকার নাই” বলে অপপ্রচার ছড়াচ্ছেন। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় আমাদের। এসব এড়াতে বেশি দাম দিয়ে হলেও অন্য দেশে ক্রয়াদেশ দিচ্ছেন দেশটির ক্রেতারা।’

অটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীন। গত জানুয়ারি-জুলাই সময়কালে দেশটিতে ১ হাজার ৪৩১ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে চীন। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে এই রপ্তানি ৪ দশমিক ২৭ শতাংশ কম। এই বাজারে দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানিকারক ভিয়েতনাম ৬৫২ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। তাদের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানির ১৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ ভিয়েতনাম থেকে গিয়েছিল। গেল সাত মাসে সেটি বেড়ে ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ যথাক্রমে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও ভারত। যুক্তরাষ্ট্রে গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ভারত ২৩২ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করে। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ। গত বছর ভারতের বাজার হিস্যা ছিল ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। গত সাত মাসে সেটি বেড়ে ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ হয়েছে।

খাদ্য সঙ্কট মোকাবেলায় আরও আড়াই লাখ টন চাল আমদানি করা হচ্ছে। এর মধ্যে সরকার থেকে সরকার (জি-টু-জি) পদ্ধতিতে থাইল্যান্ড থেকে দেড় লাখ টন নন-বাসমতি সিদ্ধ চাল আমদানি করা হবে। আর জাতীয় উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ১৭টি প্রতিষ্ঠান আমদানি করবে এক লাখ টন নন-বাসমতি সিদ্ধ চাল। আড়াই লাখ টন চাল আমদানিতে মোট ব্যয় হবে প্রায় এক হাজার ১৭ লাখ কোটি টাকা।

আজ বুধবার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এ বিষয়ে দুটি পৃথক ক্রয়প্রস্তাবের অনুমোদন দেয়া হয়।

সভায় সভাপতিত্ব করেন কমিটির আহ্বায়ক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

সভা শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের এতথ্য জানান।

তিনি বলেন, জি-টু-জি পদ্ধতিতে থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা প্রতি টন চালের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৬৫ ডলার। এই দরে দেড় লাখ টন চাল আমদানি করতে মোট খরচ বাংলাদেশী টাকায় ৫৭৮ কোটি ৯২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় অনুমোদনের জন্য এই ক্রয় প্রস্তাবের সার-সংক্ষেপে বলা হয়েছে, চালের জরুরি প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনায় নিয়ে থাই কর্তৃপক্ষকে দেড় লাখ টন নন-বাসমতি সিদ্ধ চাল এলসি খোলার ৯০ দিনের মধ্যে সরবরাহের সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে।

এতে আরো বলা হয়, সরকারি পর্যায়ে খাদ্যশস্য ক্রয়ের চুক্তি হলে তা সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থাকে না। বর্তমান পর্যায়ে সরকারি ভাণ্ডারে খাদ্য মজুদ বাড়িয়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা, জনসাধারণের মধ্যে খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তাবলয় সুসংহত করা, সরকারের নির্ধারিত বিতরণ চ্যানেল নির্বিঘ্ন পরিচালনা করা এবং খাদ্যশস্যের বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য জরুরি সরকারি পর্যায়ে খাদ্যশস্য আমদানির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

এদিকে অপর এক প্রস্তাবনায় জাতীয় উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এক লাখ টন নন-বাসমতি সিদ্ধ চাল আমদানি করার অনুমোদন দিয়েছে কমিটি বলে জানান মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, জাতীয় উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বৈদেশিক উৎস থেকে আমদানিতব্য প্যাকেজ-১ এর আওতায় এক লাখ টন চাল আমদানি করা হবে।

সূত্র জানায় প্রতি টন ৪৩ হাজার ৭২০ টাকা থেকে ৪৫ হাজার ২৭০ টাকা হারে দেশের ৩৮টি কেন্দ্রে (লটে) দুটি প্রতিষ্ঠান এই চাল সরবরাহ করবে। এক লাখ টন চাল আমদানিতে মোট ৪৩৮ কোটি ২২ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বন্যা ও ব্লাস্ট রোগের কারণে এ বছর চাহিদার তুলনায় চাল কম উৎপাদন হওয়ায় দেশে চালের বাজারে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। এ অবস্থায় জি-টু-জি পদ্ধতিতে চাল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। ভিয়েতনাম থেকে আড়াই লাখ টন চাল সরবরাহ প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কম্বোডিয়ার কাছ থেকে আড়াই লাখ টন চাল আমদানির চুক্তি হওয়ার পর ঋণপত্র খোলা হয়েছে। এ ছাড়া মিয়ানমার থেকে এক লাখ টন চাল আমদানির চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে তিন শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারের গুদামে তিন লাখ ৯৬ হাজার টন চাল এবং এক লাখ তিন হাজার টন গমসহ মোট খাদ্যশস্য মজুদের পরিমাণ চার লাখ ৯৯ হাজার টন।

আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আজ মঙ্গলবার ঢাকার কর অঞ্চল-৩ আয়োজিত আয়কর ক্যাম্প ও করদাতা উদ্বুদ্ধকরণ অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন।

মিরপুর কনভেনশন সেন্টারে এই অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা দিন দিন উন্নতি করছে। এক সময় বাংলাদেশ সাহায্যনির্ভর দেশ ছিল। এখন আগের মতো আর সাহায্য নিতে হয় না। বিদেশ থেকে যে অর্থ নেওয়া হয়; সে জন্য সুদ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ এখন বিপদগ্রস্ত ও দুর্দশাগ্রস্ত দেশগুলোকে অনুদান দেয়। এটাই উন্নয়নের পরিবর্তন। এভাবে ভবিষ্যতের দিনগুলো রচনা করা হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরে সাড়ে চার লাখ কোটি টাকার বাজেট করতে হবে।

অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, দেশে তরুণ করদাতার সংখ্যা বাড়ছে। এটা বেশ গর্বের বিষয়। গত ৮/৯ বছর ধরেই করদাতাদের মধ্যে কর প্রদানের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। তিনি করদাতাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার জন্য কর কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান বলেন, কর দিয়ে বাহাদুরি দেখানোর সময় এটাই। করসংক্রান্ত সেবা সারা দেশে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে আয়কর ক্যাম্প হচ্ছে। এখন ইউনিয়ন পর্যায়ে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) দেওয়া, ভ্যাট সেবা দেওয়া হচ্ছে। অতীতের সব দুর্নাম ঘুচিয়ে কর কর্মকর্তারা করদাতাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ, এনবিআর সদস্য আবদুর রাজ্জাক। সভাপতিত্ব করেন কর অঞ্চল-৩-এর কমিশনার নাহার ফেরদৌসি বেগম। এতে স্থানীয় বিপুলসংখ্যক করদাতা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে কয়েকজন করদাতার হাতে আয়কর সনদ তুলে দেওয়া হয়।

এই কর অঞ্চলের আওতায় আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুটি স্থানে আয়কর ক্যাম্প চালু থাকবে। দুটি স্থান হলো—পল্লবী শপিং কমপ্লেক্স ও মোহাম্মদী মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির কার্যালয়। সেসব সেবা পাওয়া যাবে, সেগুলো হলো—ইলেকট্রনিক টিআইএন প্রদান, আয়কর বিবরণী পূরণে সহায়তা করা, রিটার্ন নেওয়া, রিটার্ন দাখিলের প্রাপ্তি স্বীকারপত্র এবং রিটার্ন সনদ দেওয়া।

ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত আছে দেশের দুই পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই)। আজ রোববার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে লেনদেনের গতি বেশ বেড়েছে দুই পুঁজিবাজারে।

দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসইতে প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার ১৬ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ১৮ পয়েন্টে। দিন শেষে ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৬৬২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।

ডিএসইতে আজ দুপুর ১২টা নাগাদ ডিএসইএক্স সূচক প্রায় ৯ দশমিক ৬১ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ৬০২৭ পয়েন্টে। লেনদেন হয়েছে প্রায় ২৮৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এ সময় পর্যন্ত ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নিয়েছে ৩০৯টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার। এর মধ্যে দর বেড়েছে ১০৩টির, কমেছে ১৭৬টির। দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৩০টি কোম্পানির।

দুপুর ১২টা নাগাদ ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে ছিল সিটি ব্যাংক লিমিটেড, ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড, সাইফ পাওয়ার টেক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, আইডিএলসি, বিবিএস কেব্‌লস, লঙ্কা-বাংলা ফাইন্যান্স, উত্তরা ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মা ও ডেফোডিল কম্পিউটার লিমিটেড।

অন্যদিকে, সিএসইতে আজ দুপুর ১২টা নাগাদ সার্বিক সূচক বেড়েছে ৫৩ দশমিক ৬০ পয়েন্ট। মোট লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ১৯ কোটি টাকা। সিএসইতে লেনদেনে অংশ নিয়েছে ১৬৭টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার। এর মধ্যে দর বেড়েছে ৫৫টির, কমেছে ৯৭টির। দর অপরিবর্তিত রয়েছে ১৫টি কোম্পানির।

শিল্প সাহিত্য

শামসুর রাহমানের কিছু শক্তিশালী কবিতা ভাষা-সংগ্রাম সংগঠনের উত্তেজনা ও তেজকে ধারণ করে আছে। ভাষার জন্য, ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে তাকে পরিভ্রমণের সুযোগ করে দেয়ার জন্য এক অসহায়-অশান্ত কবির হাহাকার-

নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জ্বলজ্বলে পতাকা উড়িয়ে আছো আমার সত্তায়।
মমতা নামের পুত প্রদেশের শ্যামলিমা তোমাকে নিবিড়
ঘিরে রয় সর্বদাই। কালো রাত পোহানোর পরের প্রহরে
শিউলি শৈশবে ‘পাখী সব করে রব’ ব’লে মদনমোহন
তর্কালঙ্কার কী ধীরোদাত্ত স্বরে প্রত্যহ দিতেন ডাক। তুমি আর আমি,
অবিচ্ছিন্ন, পরস্পর মমতায় লীন,
ঘুরেছি কাননে তাঁর নেচে নেচে, যেখানে কুসুমকলি সবই
ফোটে, জোটে অলি ঋতুর সঙ্কেতে।
ভাষা নিয়ে রাজনীতি, মাতৃভাষা-ভাষাব্যবহারকারীদের ওপর নির্বিচারে চালানো নির্মমতা আর একটি ভাষার সমস্ত গৌরব-ঐতিহ্যে আঘাত হানার হিংস্রতা শামসর রাহমান দেখেছেন কাছ থেকে। প্রতিটি রক্তবিন্দু দিয়ে উপলব্ধি করেছেন সে বেদনার যাতনা। মানুষের স্বাভাবিকবৃত্তি, মৌলিক অধিকার আর সহজভাবে চলতে থাকা জীবনে আছড়ে-পড়া অনাকাক্সিক্ষত অভিঘাত ঘা দিয়েছে কবির কোমণ হৃদয়ে; তিনি প্রায়-দিশেহারা হয়েছেন মাতৃভাষার চরম দুর্দশার সময়ে। তাঁর ভাবনার প্রকাশÑ
তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে, কী থাকে আমার?
উনিশ শো’ বায়ান্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাঞ্জলি
বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী।
সে-ফুলের একটি পাপড়িও ছিন্ন হ’লে আমার সত্তার দিকে
কত নোংরা হাতের হিংস্রতা দেয়ে আসে।
এখন তোমাকে ঘিরে খিস্তি-খেউড়ের পৌষমাস!
তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো,
বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা।
(বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা)
ঊনসত্তরের অনভিপ্রেত অবিনাশী ডাকে যখন অগণন মানুষ সমবেত, তখন শামসুর রাহমান ভাবছেন জীবনের তরঙ্গভঙ্গের কাতর-আর্তনাদের বাণীভাষ্য; সিনেমা হলের কর্মচারী, সার্কাসের তরুণী, হাড্ডিসার বিত্তহীন কৃষক, মেঘনার প্রাত্যহিক মাঝি, চটকলের শ্রমিক, উদার মৃৎশিল্পী, করুণ কেরানি, তরুণ শিক্ষার্থী, নবিশী কবি- সবাই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায় তাঁর চৈতন্যলীন আধমড়া-স্বপ্ননক্ষত্রের স্পন্দনে। ফাল্গুনের রোদে তিনি দেখেন ঘরকে বাহির করা জীবনমুখী প্রবণতার নৃত্যচপল আনন্দ। লাঙল-ফসল-পাল-আগুনওম-শিস-শাড়ি-প্রতিবাদ-জলপান প্রভৃতির নিবিড় যাত্রাপথে মাঝে মাঝে যেন ইশারা জাগায়, সহপাঠিনীর চুল, প্রিয়ার রহস্যময় খোঁপা কিংবা হাসপাতালে আরোগ্য-আনত বিষণ্ন মুখ। মানবিক বাগানে বারবার হায়েনার থাবা কবিকে ‘আনন্দের রৌদ্র আর দুঃখের ছায়ায়’ শিহরিত করে প্রতিক্ষণ। তিনি দু’হাতে সাজান পুনরায় জেগে-ওঠা প্রতিবাদীচেতনার দলিলপত্র-
বুঝি তাই উনিশশো ঊনসত্তরেও
আবার সালাম নামে রাজপথে, শূন্যে তোলে ফ্ল্যাগ,
বরকত বুক পাতে ঘাতকের থাবার সম্মুখে।
সালামের চোখ আজ আলোকিত ঢাকা,
সালামের মুখ আজ তরুণ শ্যামল পূর্ব বাংলা।
(ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯)
ষাটের দশকে রাজনৈতিক টানাপড়েন, মানুষের প্রাত্যহিক সংগ্রাম-সঙ্ঘাত নতুন ভাষায় কথা বলে ওঠে শামসুর রাহমানের কবিতায়। তিনি দু’চোখ মেলে দেখতে থাকেন, আত্মায় অনুভব করতে থাকেন, দ্রুত ঘটতে থাকা ঘটনাবলি। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান বঙালি জীবনে এক বিশেষ চেতনাবিস্তারকারী ঘটনা। শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারকে প্রতিরোধ করার জন্য আপামর জনতা সেদিন সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। প্রাণ দিয়েছিল উদ্যমী তরুণ আসাদ। তার নামে ঢাকার মোহাম্মদপুরে, রাজপথে, গেট নির্মাণ আর পথচারীর মুখে আসাদের নাম-উচ্চারণ সাধারণের বোধের অন্তরালে বহন করছে বাঙলি জাতিসত্তার ঐতিহ্যিক অনুভূতির মাহাত্ম্য। তেমনই স্বদেশনিবিড় উপলব্ধির কথামালা সাজিয়ে তোলেন স্বদেশের মাটির-প্রত্যাশার-প্রাপ্তির সার্বক্ষণিক সঙ্গী ও সাধককবি শামসুর রাহমানÑ
ডালিম গাছের মৃদু ছায়া আর রোদ্দুর-শোভিত
মায়ের উঠোন ছেড়ে এখন সে-শার্ট
শহরের প্রধান সড়কে
কারখানার চিমনি-চুড়োয়
গমগমে এভেন্যুর আনাচে কানাচে
উড়ছে, উড়ছে অবিরাম
আমাদের হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে,
চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়।
আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা
সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;
আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।
(আসাদের শার্ট)
রাহমান তাঁর কবিতায় গণমানুষের প্রাত্যহিক-রাজনৈতিক বিক্ষোভ এবং মিছিলের অগ্রবর্তী মানুষের আবেগ-অস্থিতির প্রাবল্য এঁকেছেন। তাঁর প্রজন্মের ভাষা তিনি নির্মাণ করতে পেরেছেন আবেগ আর বাস্তবতার বিরল-মিশ্র অভিনিবেশে। প্রাগ্রসরতা, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র প্রভৃতি তাঁর ভাবনাবিশ্বের বিশেষ বিশেষ প্রকোষ্ঠ।
কবি সৈয়দ শামসুল হক শামসুর রাহমানকে ‘স্বাধীনতার কবি’ অভিধায় ভূষিত করতে চান। কেননা, তাঁর কবিতায় জাতির আত্ম-জিজ্ঞাসার ভাষা নির্মিতি লাভ করেছে। রাহমানের কবিধর্ম হলো- মানবতাবিরোধী কর্মযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। যোগ্যতা অনুযায়ী মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তিনি ছিলেন সোচ্চার। আলোকিত মানবসভ্যতা বিনির্মাণ আর আধুনিকতার প্লাটফরমে শিল্পচর্চার বিষয়টি লালন করেছেন তিনি আমৃত্যু। পরাধীনতার-শোষণের গানিমোচনের যে মানবিক আকাক্সক্ষা তিনি বর্ণনা করেছেন, তা একজন কথাকারিগরের আপন-অভিব্যক্তিরই বহির্প্রকাশ মাত্র। স্বাধীনতার জন্য আকুল অপেক্ষা, প্রজন্মপ্রহর আর অর্থনৈতিক স্থিতি-অস্থিতির কালযাপনের ক্লান্তি শামসুর রাহমান অনুভব করেন ‘শূন্য থালা হাতে’ ‘পথের ধারে’ বসে-থাকা ‘হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী’র উপলব্ধির গাঢ়তায়। কবি বাঙালি জাতির মনন-চেতনকে আঁকছেন এভাবে-
তোমার জন্যে,
সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক,
কেষ্ট দাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা,
মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি,
গাজী গাজী ব’লে যে নৌকা চালায় উদ্দাম ঝড়ে
রুস্তম শেখ, ঢাকার রিক্শাওয়ালা, যার ফুসফুস
এখন পোকার দখলে
আর রাইফেল কাঁধে বনে-জঙ্গলে ঘুরে-বেড়ানো
সেই তেজী তরুণ যার পদভারে
একটি নতুন পৃথিবী জন্ম হ’তে চলেছে-
সবাই অধীর প্রতিক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা।
(তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা)
সেই প্রত্যাশিত স্বাধীনতার উপমান তাঁরই কবিতায় কত-না বিপুল-ব্যাপৃত। ‘রবি ঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান’ আর নজরুলের ‘সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা’ সৃজন-ব্যাকুলতায় জনতাকে যেন হাতড়ে ফিরতে হয় স্বাধীনতার স্বাদ। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম, প্রাপ্তি-প্রত্যাশায় নিবিড় প্রতিবাদের ঝড়, বীজ বুনে ফসলের প্রত্যাশায় নীরবে প্রহর গুনতে-থাকা কৃষকের অনাগত প্রসন্ন মুখ কিংবা গ্রাম্য কিশোরীর অবাধ গতিবিধি- সবই যেন কেবল স্বাধীনতারই অন্য অন্য নাম। কৃষিনির্ভর উৎপাদনমুখি বাংলাদেশে কবি দেখতে চান অফুরন্ত শস্যরাজি আর শস্যকর্তকের সাংবাৎসরিক উৎসবঘেরা জীবন। স্বাধীনতার মানে- কবি বুঝতে চান, বোঝাতে চান, শ্রমিক-মজুরের স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন, মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন-সফলতা আর শিক্ষা ও প্রগতির নিখাদ সোজা পথ। তিনি লেখেন:
স্বাধীনতা তুমি
বটের ছায়ায় তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীর
শানিত কথার ঝলসানি-লাগা সতেজ ভাষণ।
স্বাধীনতা তুমি
চা-খানায় আর মাঠে-ময়দানে ঝোড়ো সংলাপ।
(স্বাধীনতা তুমি)
প্রকৃতির নির্মলতা-স্বাভাবিকতা, পরিবার ও সমাজের নীতিপ্রীতি-ধর্মযাপন, মায়ের আনন্দ, বোনের খুশি, সাফল্যের পথে বন্ধুর এগিয়ে চলা- সবকিছুর ভেতরে লুকিয়ে থাকে ঝিনুকের মোড়কে থাকা মুক্তার মতো সম্ভাবনা। শামসুর রাহমান মায়ের শুকাতে- দেয়া শাড়ি আর বোনের মেহেদীরাঙা হাতের আহ্বানে দেখতে পান শান্তিনিবিড় মাতৃভূমি। বাবার প্রার্থনারত হাতের তালুতে ঝুলতে থাকা থোকা থোকা স্বপ্ন বুনতে চান তিনি স্বাধীন দেশের উর্বর মাটিতে। আর ঘরে ঘরে নির্মাণ করতে চান অফুরন্ত শান্তির সুবাতাস। তাঁর চিন্তাভাষ্য-
স্বাধীনতা তুমি
গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল,
হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো উদ্দাম।
স্বাধীনতা তুমি
খোকার গায়ে রঙিন কোর্তা,
খুকির অমন তুলতুলে গালে
রৌদ্রের খেলা। (ওই)
স্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছা তাই করা নয়; তারও আছে সীমারেখা, রয়েছে মাপকাঠি। প্রাপ্তির স্বস্তি ও আনন্দ প্রকাশে আমরা যেন দিশেহারা হয়ে না পড়ি; সীমানা অতিক্রম না করি সে বিষয়ে কবি শামসুর রাহমান আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন। নীড়ের ঠিকানা- তার স্থির অবস্থিতি, অনুভূতির গীতলতা আর অর্জনের অভিজ্ঞতা আমাদেরকে স্বাধীনতার স্বপ্নপূরণে যে সহায়তা ও নিশ্চয়তা প্রদান করে, তার মাহাত্ম্য অনুধাবন করতে কবি যুগিয়েছেন চিন্তাশক্তির খোরাক। কবিতার স্বপ্নময়তা আর রীতিবদ্ধতার ফ্রেমে সাজিয়ে তোলেন কবি স্বাধীনতার স্বাদ-
স্বাধীনতা তুমি
বাগানের ঘর, কোকিলের গান,
বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,
যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।
(ওই)
ভাষার স্বাধীনতা আর কবিতার মুক্তিই যে মানবজীবনের সকল ব্যাপ্তি-প্রাপ্তির মূল উৎসভূমি- এই চেতনার চিন্তাভাষ্য সাজিয়েছেন তিনি ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায়।

পাগলী 
------ সো‌হেল চৌধুরী

পাগলীটা আজ মা হ‌য়ে‌ছে, প্র‌তি বছ‌রের মত
তা‌কে ঘি‌রে তাই গান ধ‌রিল, মশা মা‌ছি শত শত।

জা‌নেনা পাগলী সোন-ম‌ণি ব‌লে, আদর কিভা‌বে ক‌রে,
অনাহারী সে ক্ষুধার জ্বালা, ভু‌গি‌ছে ব্যাথার জ্ব‌রে।

‌কে জা‌নি কে, মায়া ক‌রে তা‌রে, ছু‌ড়িয়া দিয়া‌ছে রু‌টি,
মুহু‌র্তে ভো‌লে ব্যাথা-বেদনা, হে‌সে হয় কু‌টি কু‌টি।

কুকু‌রের মত প‌থের ধুলায়, শিশু‌টি জন্ম নিল,
‌কোন সাহ‌সে? কোন অপরা‌ধে? "জারজ" খেতাব পেল?

ডাক্তার না‌কি ই‌ঞ্জি‌নিয়ার? বড় হ‌লে সে কি হ‌বে?
পাগলী কি আর এসব ভা‌বে? ভা‌বে কি খে‌তে পা‌বে।

বড় হ‌বে শিশু প‌থের ধু‌লোয়, সা‌থে বড় হ‌বে পাপ,
‌বিনা অপরা‌ধে এই  পৃ‌থিবী, দি‌য়ে যা‌বে অ‌ভিশাপ।

পু‌লি‌শে তাড়াল, ঘুম থে‌কে তু‌লে, ভিআই‌পি এ‌রিয়া ব‌লে,
ও‌তো পাগলী! এখা‌নে কেন? ও, থাক‌বে আস্তাকু‌ড়ে।

লাল গা‌ড়ি‌তে মায়া ক‌রে কে,  দিল জামা ও ফল,
নতুন জামা! তবু, হা‌সে'নী পাগলী, চো‌খে দেখা গেল জল।

হঠাৎ,
বু‌কের মা‌নিক হারা‌লো পাগলী, কোন এক ঝ‌ড়ো রা‌তে,
বুক চাপ‌ড়ে, কা‌ঁদে থে‌মে থে‌মে, যন্ত্রনা দিন কা‌টে।

আকা‌শের দি‌কে তা‌কি‌য়ে পাগলী, বিড়‌বি‌ড়ে কি‌যে কয়,
‌কোনো প‌থি‌কে বো‌ঝে না সে ভাষা, বো‌ঝে শুধু দয়াময়।

মা‌নিক হারা‌নো যন্ত্রনা বু‌কে, পে‌টে ক্ষুধা- ব্যাথা-মালা,
রু‌টি দি‌য়ে তা‌রে হা‌য়েনার দ‌লে, (আবার) মেটা‌বে যৌন জ্বালা।

‌কোন এক রা‌তে অন্ধ গ‌লি‌তে, শোন য‌দি ঘেউ ঘেউ,
আবার হয়‌তো মা হ‌বে সে, বাবা হ‌বেনা তো কেউ।

জুলাই ১৯৯১, মস্কো

বিয়ারের খালি বোতলগুলো সারা মেঝেতে গড়িয়ে বেড়াচ্ছে। অনিমেষ কী উপলক্ষে অতগুলো বিয়ার কিনে এনে ফ্রিজে সাজিয়ে রেখেছিল, জানি না। কিন্তু জানি, ফিরে এসে ও যখন দেখতে পাবে সব কটি বোতল খালি হয়ে মেঝেতে গড়িয়ে বেড়াচ্ছে, তখন ঠোঁট চেপে হাসবে। কারণ, এভাবে আমার নীতিভ্রষ্ট হওয়ার, আমার পতনের, আমার পাপের, আমার ভণ্ডামির দৃষ্টান্ত দিনকে দিন বাড়তে দেখে ওর নিজেকে বিজয়ী মনে হবে। ও মনে করার সুযোগ পাবে যে আমরা নীতিবাগীশ কমরেডরা নীতিহীন স্পেকুলান্তদের কাছে শুধু হেরেই যাইনি, বেঁচেও আছি অনেকটা ওদের অনুগ্রহেই। ওরা আমাদের অঢেল অনুগ্রহ দেখাতে পারছে খুবই সস্তায়: এখানে এখন চব্বিশ বোতল বিয়ারের দাম পাঁচ মার্কিন ডলারের কম হবে। অনিমেষদের সব হিসাব-নিকাশ এখন মার্কিন ডলারে।

সুতরাং, আমার দরদি রুমমেট তার ফ্রিজ খালি করার দোষে আমার প্রতি একটুও বিরূপ হবে না। বরং উল্টো, আমি যদি ওকে বলি বিয়ারগুলো ভেজাল ছিল, এক বোতল ভোদকা আনো, গলা পর্যন্ত খেয়ে আজ মাতাল হই, তাহলে ও হেসে বলবে, ‘এখন থাক, সন্ধ্যাবেলা খাইয়েন।’

সন্ধ্যায় সে এক বোতল স্মিরনোফ অবশ্যই আনবে। সোভিয়েত ইউনিয়নে তৈরি স্তালিচ্‌নায়া কিংবা মস্কোফ্স্কায়া ভোদকা নয়—এসব দেশি মাল অনিমেষরা এখন ছোঁয় না। যা কিছু সোভিয়েত, তাতেই ওরা এখন নাক ছিটকায়। যা কিছু আমেরিকান, যা কিছু ইউরোপীয়, তাতেই ওদের আকর্ষণ, তাতেই প্রেস্টিজ। সুতরাং, অনিমেষ আমার জন্য আমেরিকান ভোদকা স্মিরনোফ আনবে। সিগারেট চাইলে ওভারকোটের পকেট থেকে বের করে দেবে রথম্যানস, ডানহিল, মালবোরোর প্যাকেট।

আমি যখন যা চাই, অনিমেষ তা-ই এনে দেয়। কিন্তু আমি জানি, ওর এই উদারতা সরল নয়। বরং এটা ওর একটা কৌশল। আসলে আঘাত। এভাবে ছদ্মমধুর আঘাত হানতে হানতে সে আমাকে ভুল আর নিজেকে সঠিক প্রমাণ করছে বলে মনে মনে সুখ পায়। নইলে আমি যখন ওকে বলি, এসব চোরাকারবারি আর কোরো না, অন্তত ডলার কেনাবেচার মতো মর্যাদাহানিকর ও বিপজ্জনক ব্যবসাটা বন্ধ করো, তখন আমার কথা গায়ে না মেখে কেন সে নীরবে শুধু হাসবে?

যখন আমি খেপে যাব, যখন আমার কথাবার্তা সে একদমই আমলে নিচ্ছে না দেখতে পেয়ে তার সঙ্গে ঝগড়া বাধানোর চেষ্টা করব, তখন সে ব্যাখ্যা করে আমাকে বোঝাতে চাইবে যে গর্বাচভের নড়বড়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে, ইয়েলৎসিনের স্বপ্নচারী রাশিয়ায় কোনো ব্যবসাই এখন আর চোরাকারবারি নয়। আসলে চোরাকারবারি বলে কিছু নেই, সব ধরনের আর্থিক কারবারই হলো ব্যবসা। সে আমাকে বলবে, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা আমাকে মানুষ হওয়ার জন্য মস্কো পড়তে পাঠানোর সময় যেসব সদুপদেশ আমার অন্তরে গেঁথে দিয়েছেন, এখন সেগুলো মুছে ফেলা দরকার। কারণ, ওই নেতাদের ছেলেমেয়েরাই এ দেশে এসে সব সদুপদেশ ভুলে গেছে। নেতারা নিজেরাও এ দেশে অতিথি হয়ে এসে গোপনে ডলার ভাঙিয়েছেন চোরাবাজারে; সোভিয়েত আইনে কী লেখা আছে, তাতে তাঁদের কিচ্ছু যায় আসেনি।

অনিমেষ মার্ক্স-লেনিনের নাম উচ্চারণ করে আমাকে বলবে বাস্তব জীবনে তাঁদের ‘ইউটোপিয়া’র কানাকড়ি দাম নেই। বলবে, তত্ত্বকথায় যে জীবন চলে না, এটা সবাই বোঝে, বুঝি না শুধু আমি। একপর্যায়ে সে এমন কথাও বলে বসবে: ‘আপনি মন দিয়ে লেখাপড়া করে দেশে ফিরে গিয়ে হবেন নীতিনিষ্ঠ সাংবাদিক, আর আমি দেশে ফিরব নীতিনিরপেক্ষ রুপার্ট মারডক হয়ে।’ এ রকম সাংঘাতিক কথা বলতে বলতে সে হাসবে; তার হাসি দেখে আমার পিত্তি জ্বলে যাবে এবং আমার চোখমুখ দেখে সেটা সে বুঝতে পারবে। তখন সে আমাকে আরও উত্তেজিত করার মতলবে আরও প্রসারিত হাসি হেসে বলবে, ‘আমার নিউজপেপারেই আপনি চাকরি করবেন। আমি আপনাকে সম্পাদক বানাব।’

আমার ওকে মারতে ইচ্ছা করবে। কিন্তু মারতে না পেরে ওর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেব। ওর মুখের দিকে আর তাকাবই না। সে-ও আমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করবে না; শুধু মাঝেমধ্যে আড়চোখে তাকিয়ে দেখবে, আমাকে নিজের আবেগ উপভোগ করার সুযোগ দেবে।

দরজায় টোকা। খুলে দেখি, শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিন কনস্তান্তিন কাভালিওভ। সম্ভাষণ জানিয়ে সসম্মানে ভেতরে ডাকলাম। মধ্যবয়সী ভদ্রলোক ভেতরে ঢুকে মেঝেতে ছড়ানো বিয়ারের খালি বোতলগুলো দেখে ভুরু কুঁচকে আমার মুখের দিকে তাকালেন। আমি হেসে তাঁকে বোঝাতে চাইলাম যে আমি ঠিকঠাক আছি। তিনি অনিমেষের ডিভানে বসলেন। বললাম, ‘আপনাকে চা দিই?’ শুকনো মুখে বললেন, ‘আর কিছু নাই?’

ফ্রিজ খুলে দুটো আপেল বের করে আনলাম। দেখে ভদ্রলোকের চোখমুখে কোনো সাড়া জাগল না। নিশ্চয়ই রুটি-মাখন-সজেস প্রত্যাশা করছেন। কিন্তু কিচ্ছু নেই। কে কিনবে? অনিমেষ তিন দিন ধরে লাপাত্তা। আমার খাওয়াদাওয়া চলছে ক্যানটিনে। দেখলাম ফ্রিজের মাথায় এক খণ্ড রুটি। তিন দিন আগে কেনা হয়েছিল, খাওয়া হয়নি। এখন ওটা শুকিয়ে কাঠ, দেয়ালে পেরেক ঠোকার কাজে ব্যবহার করা যাবে।

আপেল কেটে দিলাম, কেটলিতে পানি বসালাম। কাভালিওভ এক টুকরো আপেল তুলে নিয়ে কামড় দিয়ে বললেন, ‘বিয়ার কি সব শেষ?’ আমি নিশ্চিত নই। ফ্রিজ খুলে দেখলাম, একটাও নেই। কিন্তু কী আশ্চর্য, একটা ভোদকার বোতল আছে! স্মিরনোফ! অনিমেষের কেনা। ওরা এখন আর সোভিয়েত মদ-সিগারেট খায় না।

বোতলটা কাভালিওভের নজরে পড়ল। চকচক করে উঠল তাঁর দুই চোখ। আপেলে বড় একটা কামড় বসিয়ে কসমস শব্দে চিবুতে চিবুতে বললেন, ‘ভোদকা দাও। আরও আপেল বের করো।’

কিন্তু ফ্রিজে আর আপেল নেই। আমি টেবিল থেকে একটা পানি খাওয়ার গ্লাস টেনে নিলাম। একটুখানি মদ ঢাললাম। কাভালিওভ ভদ্রতা করে বললেন, ‘আর তুমি?’

‘অনেকগুলো বিয়ার খেয়েছি।’

কিন্তু তিনি নাছোড়। মদ খাওয়ার সময় সব রুশিই এ রকম: একা খাবে না। সঙ্গী হতেই হবে। কাভালিওভ নিজে বোতলটা টেনে নিয়ে আরেকটা গ্লাসে মদ ঢেলে দিলেন। তারপর গ্লাসটা আমার হাতে দিয়ে নিজের গ্লাস তুলে নিলেন। নিজের গ্লাস দিয়ে আমার গ্লাসে টোকা দিলেন। তারপর কিছু না বলে পুরোটা মদ একবারে গলায় ঢেলে দিলেন। আমিও তা-ই করলাম, কিন্তু আমার বিচ্ছিরি লাগল। গ্লাস ভর্তি করে পানি ঢেলে নিয়ে ঢকঢক করে সবটুকু পানি খেয়ে ফেললাম, তারপর কিছুই না ভেবে হঠাৎ বললাম, ‘কনস্তান্তিন ইভানিচ, ছাত্রের ঘরে গিয়ে শিক্ষকের মদ খাওয়া—এ রকম কি আগেও ছিল?’

তিনি এমন এক ভঙ্গিতে নিঃশব্দে হাসলেন যে আমার মনে হলো, তাঁর সব ব্যক্তিত্ব ধুলায় মিশে গেছে। ভুলে গেছেন যে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির মস্কো সিটি কমিটির একজন নেতা এবং সে জন্যই পাত্রিসা লুমুম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা বিভাগের ডিন হতে পেরেছেন।

একটু পর নিজেই গ্লাসে মদ ঢেলে নিলেন। গ্লাসের প্রায় অর্ধেকটা ভরে উঠল ভোদকায়। ঢকঢক করে তিন-চার ঢোঁকে গিলে ফেললেন সবটুকু, তারপর গলা পরিষ্কার করে বললেন, ‘তোমার রুমমেট কোথায়?’

আমি জানি, ভদ্রলোক আসলে টোকা দিয়েছিলেন অনিমেষের দরজায়। অনিমেষ তাঁকে মদ খাওয়ায়, হয়তো কিছু উপহার-টুপহারও দেয়। নইলে তিনজনের ঘরে আমরা দুজন বাস করার অনুমতি পেলাম কী করে।

হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কনস্তান্তিন ইভানিচ, আপনি আমার ঘরে বসে মদ খাচ্ছেন, কর্তৃপক্ষ জানতে পারলে আমার কোনো সমস্যা হবে না তো?’

হেসে বললেন, ‘কে তোমার সমস্যা করতে আসবে? তাকেও গলা পর্যন্ত মদ খাইয়ে দিয়ো।’

আবার মদ ঢেলে নিলেন, তারপর ফ্রিজের মাথায় শুকনো রুটির দিকে আঙুল তুলে বলেন, ‘ওটা নিয়ে এসো।’

আমি কাঠের মতো শক্ত পাউরুটিটা নিয়ে করাতের মতো রুটিকাটা ছুরি দিয়ে কাটার চেষ্টা করতে লাগলাম। কুড়মুড় শব্দ উঠল, ধুলোর মতো রুটির চূর্ণ ঝরে পড়ল ছুরির দুই পাশ দিয়ে। রুটির ফালি নয়, দুইটা টোস্ট বিস্কুট দেওয়া গেল তাঁকে। তিনি কড়মড় করে চিবুতে চিবুতে বললেন, ‘গরিব হয়ে গেলাম, তোমাদের ঘরে এসে একটু খানাপিনা করলে কি মহাপাপ হয়ে যাবে আমার?’

রক্ষা করো আল্লাহ! পাত্রিস লুমুম্বা গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিস্টোরি-ফিলোলজি ফ্যাকাল্টির একজন সহকারী ডিন, একজন অধ্যাপক, এই কথা বলছেন তৃতীয় বিশ্বের এক গরিব দেশ থেকে বৃত্তি নিয়ে আসা এক ছাত্রের ঘরে এসে!

‘পিরিস্ত্রোইকা শেষ হতে হতে আমরা মরে যাব। সোভিয়েত ইউনিয়নে যখন আমেরিকার মতো প্রাচুর্য আসবে, তত দিনে আমাদের কবরে ঘাস গজিয়ে যাবে। যে কটা দিন বেঁচে আছি, তোমাদের ঘরে এলে একটু খেতেটেতে দিয়ো।’

টোস্ট বিস্কুটে রূপান্তরিত রুটির টুকরো চিবুতে চিবুতে পরিহাসের মলিন হাসি ফুটে উঠল কাভালিওভের মুখে। আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বাজে। ক্যাম্পাসের ক্যানটিন বন্ধ হতে আরও আধা ঘণ্টা বাকি।

‘ঘরে তো আর কিছু নাই। চলুন, ক্যানটিনে যাই।’

‘স্পাসিবা দারাগোই। অনেক ধন্যবাদ। এখন যেতে হয়। ঘর অনেক দূরে। ভালো থেকো। বেশি মদ খেয়ো না। পড়াশোনা ভালোভাবে করো।’

ঝুলিটা হাতড়ে নিয়ে কাঁধে ফেলে উঠে পড়লেন। এমনভাবে টলে উঠলেন, যেন তাঁর পায়ের তলার মাটি নড়ছে। মলিন হেসে বললেন, ‘ভালো ছেলে তুমি। অনিমেষও ভালো ছেলে। মেঝিনস্কিও ভালো মানুষ। আমি যে তোমার ঘরে এসেছিলাম, মেঝিনস্কিকে বোলো না কিন্তু। তোমরা সবাই ভালো। শুধু আমিই খারাপ। আমিই শুধু নষ্ট হয়ে গেছি। কোনো আদর্শ আর নাই, কোনো স্বপ্ন আর নাই। আমি মরে যাব। শিগগিরই আমি মরে যাব। দাসবিদানিয়া।’

মেঝেতে ছড়ানো খালি বোতলগুলো তাঁর পায়ের আঘাতে টুংটাং শব্দ করে গড়াগড়ি আরম্ভ করল। টলোমলো পায়ে বেরিয়ে গেলেন কমরেড কনস্তান্তিন ইভানোভিচ কাভালিওভ। ঘরজুড়ে গভীর বিষাদ নেমে এল। স্মিরনোফের অর্ধেক খালি বোতলটা টেবিলের মাঝখানে নির্বিকার দাঁড়িয়ে রইল।

দরজাটা বন্ধ করা হয়নি, সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। ওই ফাঁক দিয়ে কেউ একজন উঁকি মারল। উঠে দরজার কাছে এগিয়ে গেলাম। একটা রুশি লোক। চেনা চেনা লাগল, মনে মনে একটু হাতড়াতেই চিনে ফেললাম। গালভাঙা ছোটখাটো আমলার মতো চেহারার এই লোকটা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্টো পাশের দরজিখানার কাটার মাস্টার ছিল। কোনো সম্ভাষণ না করে আমার ঘরের মেঝেতে ছড়ানো শূন্য বোতলগুলোর দিকে চেয়ে আছে।

‘কী ব্যাপার?’ আমি বললাম।

‘বোতলগুলো নিতে পারি?’

‘কেন?’

‘বিক্রি করব।’

‘কেন? আপনার দরজিগিরির কী হলো?’

‘বেতন কম। কী রকম ইনফ্লেশন হয়ে গেছে দেখছেন না?’

আমার মনের মধ্যে একটা নিষ্ঠুর মতলব জেগে উঠল। আমি তাকে ঘরের ভেতরে ডেকে নিয়ে অনিমেষের ডিভানে বসালাম। তার মুখভঙ্গি লক্ষ করে দেখতে লাগলাম। সে হয়তো ভাবছে, আমি তাকে চা সাধব, রুটি-মাখন খেতে দেব। কিন্তু না, আমি তাকে পেয়ে বসেছি। প্রায় বছর তিনেক পর।

‘আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না?’ জিজ্ঞাসা করলাম।

‘না তো!’

‘মনে করার চেষ্টা করুন। বছর তিনেক আগে আপনি আমাকে আপনার দরজিখানা থেকে বের করে দিয়েছিলেন।’

‘কী? হতেই পারে না। কেন আমি আপনাকে বের করে দেব?’

‘কারণ, তখন সমাজতন্ত্র ছিল, শ্রমিকরাজ ছিল।’

‘বুঝলাম না, কী বলছেন এসব?’

‘আমি আপনার কাছে একটা প্যান্ট বানিয়ে নিতে গিয়েছিলাম। তখন ছিল শীতকাল। আমার পরনে ছিল আন্ডারগার্মেন্ট, শার্ট, তার ওপর মোটা সোয়েটার ইন করে পরে তার ওপর পরেছিলাম ওভারকোট। আপনি যখন আমার প্যান্টের মাপ নিচ্ছিলেন, তখন আমি শুধু আপনাকে বলেছিলাম, মোটা কাপড়চোপড় পরে আছি, মাপটা একটু টাইট করে নেবেন। আর ব্যস, তাতেই আপনার ইজ্জতে লেগে গেল। আপনি আমাকে বললেন, তুই আমাকে দরজিগিরি শেখাতে এসেছিস? যা, বেরিয়ে যা। আপনি আমার অর্ডারটা আর নিলেনই না। আমি সরি বললাম, আপনার হাতে-পায়ে ধরে অনুরোধ করলাম, কিন্তু আপনি আমাকে বের করে দিলেন। কারণটা প্রথমে বুঝিনি। পরে বুঝেছি, আপনি চাকরি করেন সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের, দিনে একটা প্যান্ট সেলাই করলে মাস শেষে যা বেতন পাবেন, দশটা করলেও তা-ই পাবেন। তাহলে দশটা প্যান্ট সেলাই করার দরকার কী? তাই না?’

লোকটা চুপ করে রইল। আমি বললাম, ‘এই আপনার মতো লোকেরাই সমাজতন্ত্রের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। এখন খালি বোতল কুড়িয়ে বেড়াতে খুব সুখ লাগছে, তাই না?’

লোকটার মধ্যে তেমন কোনো ভাবান্তর দেখতে পেলাম না। সে বেশ দরকারি ভঙ্গিতে বলল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। এখন বোতলগুলো কি আমি নিতে পারি?’

আমি জেদি সুরে বললাম, ‘না। আপনাকে দেব না। সেদিনের ঘটনার জন্য আপনি একবার সরিও বললেন না।’

এবার সে তড়বড় করে বলতে লাগল, ‘দুঃখিত, দুঃখিত। ওই দিন হয়তো কোনো কারণে আমার মেজাজটা ভালো ছিল না। হয়তো আগের রাতে বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছিল। আমার বউটা ছিল খুবই খারাপ। জীবনটা আমার একদম শেষ করে দিয়েছে। মাগি মরেছে, আমার আর এখন মেজাজ খারাপ হয় না। আসবেন, একটা কেন, দশটা প্যান্ট বানিয়ে দেব।’

‘ঠিক আছে, নিয়ে যান।’

বলামাত্র লোকটা উঠে বোতলগুলো কুড়োতে আরম্ভ করে দিল। একটা করে বোতল ঝুলিতে ভরতে ভরতে টেবিলে স্মিরনোফের বোতলটার দিকে আড়চোখে তাকাতে লাগল। তা দেখে আমার হাসি পেল।

সব বোতল ব্যাগে পুরে নেওয়ার পর লোকটা কোমর সোজা করে দাঁড়িয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে হাসিমুখ দেখাল। মনে মনে বললাম, এমন নির্লজ্জ মদখোর জাত কি পৃথিবীতে আর আছে? এরা বিপ্লব করেছিল কীভাবে?

তবু দয়া হলো। কাভালিওভের গ্লাসে ঢেলে দিলাম। ঢক করে গলায় চালান করে দিল। তারপর হাতের চেটোয় মুখ মুছে ধন্যবাদ বলে বোতলভরা ব্যাগটা কাঁধে ফেলে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। বেরোনোর আগমুহূর্তে আমার মুখের দিকে ফিরে বলে, ‘আসবেন কিন্তু প্যান্ট বানাতে।’

মনে মনে বললাম, যা ভাগ! কার্ল মার্ক্সের জন্য দুঃখ হলো, বেচারি বুঝতে পারেননি সব সম্পত্তির মালিক রাষ্ট্র হলে আসলে কোনো মালিকই থাকে না। আমি দেখেছি, খোলা আকাশের নিচে বাঁধাকপি, আলু, বেগুন, টমেটো, মিষ্টিকুমড়া, শসা, গাজর, লাউয়ের স্তূপ; পাহাড়ের মতো, সব পচে যাচ্ছে। ফেদিয়া, সাশ্‌কা, আন্দ্রেইউশকা, লিয়েন্কা, কাতিউসা, ভের্কা—সব হারামজাদা-হারামজাদিরা মদ খেয়ে গ্যাঁজাচ্ছে। বিকেল পাঁচটা বাজলেই ছুটবে ঘরের দিকে। মাস শেষে কেউ বেতনের এক পয়সাও কম পাবে না।

দরজা হালকা ভেড়ানো ছিল, হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল, ঝড়ের মতো ঢুকে পড়ল উদ্‌ভ্রান্ত চেহারার এক তরুণী: ‘তোর ঘরে রুটি আছে?’ বলতে বলতে ফ্রিজের দিকে এগিয়ে গেল। ফ্রিজ খোলার আগেই ওর নজরে পড়ল ফ্রিজের মাথায় রাখা শুকিয়ে যাওয়া রুটিটা, যেটার কিছু অংশ কাভালিওভ খেয়ে গেছেন। লুফে নিয়ে কড়মড় শব্দে চিবুতে আরম্ভ করে দিল। ছিপছিপে পাতলা রুশ তরুণী। গড়পড়তা রুশ মেয়েদের মতো গোলগাল নয়। গাল দুটো ভাঙা, নাক তরবারির মতো খাড়া, গ্রীবা দীর্ঘ, উষ্কখুষ্ক চুলগুলো সোনালি, বড় বড় নীল চোখে উদ্‌ভ্রান্ত, ঝোড়ো চাহনি। বিস্ফারিত চোখে রুটিটা চিবিয়ে চলেছে। রুটি শুকনো, তার মুখের ভেতরেও বোধ হয় কোনো রস নেই, ফলে ঢোঁক গিলতে পারছে না, হাঁসফাঁস করছে। লম্বা গ্রীবাটা আরও লম্বা হয়ে যাচ্ছে, গলায় শামুক আটকে যাওয়া রাজহাঁসের মতো দেখাচ্ছে ওকে।

হ্যাঁচকা টানে ফ্রিজের দরজা খুলে ফেলল; ভোদকার বোতল দেখে ফ্যাসফেসে শ্বাসরুদ্ধ গলায় উচ্ছ্বসিত ধ্বনি করে উঠল, ‘আহ্, পেয়েছি!’ বোতলটা খপ করে ধরে বের করে এনে ফোঁস করে একটা দম ফেলে অনাবশ্যক জোরে মোচড় দিয়ে ছিপি খুলল; বোতলের মুখেই মুখ লাগিয়ে ঢকঢক করে ভোদকা গিলতে শুরু করল, যেন নির্ভেজাল পানি খাচ্ছে। এক দুই তিন করে পাঁচটা পরিপূর্ণ ঢোঁক গিলে মুখ থেকে বোতলটা নামাল, ছিপি লাগাল, আবার ফ্রিজের ভেতরে রেখে দিয়ে দড়াম শব্দে ফ্রিজের দরজাটা বন্ধ করে এবং আমার দিকে না তাকিয়েই ‘ধন্যবাদ’ বলে ঘরের দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

‘কে তুমি?’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

মেয়েটা ঝট করে ঘাড় ফিরিয়ে আগুনচোখে শুধু একঝলক তাকাল, তারপর হ্যাঁচকা টানে দরজা খুলে বেরিয়ে গিয়ে প্রচণ্ড শব্দে সেটা ফের বন্ধ করে দিল।

একটু পরই করিডর থেকে চিৎকার ভেসে এল, ‘সেদিন আর দেরি নাই। তুই আমার পায়ে ধরে কাঁদবি আর মাফ চাইবি। কিন্তু মাফ আমি করব না। গুলি করে মারব। তোর লাশ আমি কুকুর দিয়ে খাওয়াব।’

করিডরে বেরিয়ে দেখি মেয়েটা নাইজেরিয়ার এক ছেলের ঘরের দরজায় এলোপাতাড়ি লাথি মারছে আর চেঁচাচ্ছে। আমাকে দেখতে পেয়ে চিৎকার বাড়িয়ে দিল, ‘সব কটা বিদেশিকে রান্নাঘরে ঢুকিয়ে গ্যাসের চুলায় পুড়িয়ে মারব। কুত্তার বাচ্চারা, কার খাস? কার পরিস? কার বিছানায় ঘুমাস?’

‘কী হয়েছে? এভাবে চেঁচাচ্ছ কেন?’ আমি বললাম।

মেয়েটা একটা বিচ্ছিরি গালি ছুড়ে দিল। তারপর দরজায় জোরে একটা লাথি মেরে ছুটে এল আমার দিকে, যেন পাগলা কুকুর ছুটে আসছে কামড়াতে। আমি তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে দরজা লক করে দিলাম। সে দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে বলল, ‘খোল খোল, তোকে নয়। তোকে মারব না। দরজা খোল।’

কিন্তু আমি সাড়া দিলাম না।

মেয়েটি ও বন্ধু, ও বন্ধু বলে ডাকতে লাগল। পাগল হয়ে গেছে। রাশিয়া জারের যুগে ফিরে যাচ্ছে, দস্তয়েফস্কির ম্যাডহাউসে পরিণত হচ্ছে।

‘খুলবি না? তাহলে তোকেও মারব। কালাশনিকভ দিয়ে গুলি করে সবগুলার খুলি উড়িয়ে দেব।’

একটু পরই দুটি পুরুষ কণ্ঠ, ধস্তাধস্তি এবং মেয়েটার চিল চিৎকারে আমার কানে তালা লেগে গেল।

আমার হঠাৎ লেনিনকে মনে পড়ল। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। ফ্রিজ খুলে ভোদকার বোতলটা বের করলাম।

 

স্মৃতি অম্লান ১৯৭১

আবুল মাল আবদুল মুহিত

প্রচ্ছদ: অশোক কর্মকার, প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, প্রকাশকাল: জুলাই ২০১৭, ২৮৮ পৃষ্ঠা, দাম: ৫৫০ টাকা।

নতুন কলেবরে, নতুন আঙ্গিকে এবং আরও নতুন তথ্য সংযোজিত, পরিমার্জিত হয়ে প্রকাশিত আবুল মাল আবদুল মুহিতের স্মৃতি অম্লান ১৯৭১ বইটি পাঠককে এক নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করবে। মোট ১৩টি অধ্যায়ে বিভক্ত এ বইয়ে এমন সব তথ্য লেখক তাঁর অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে তুলে ধরেছেন, আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে, সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যা সন্দেহাতীতভাবে সংযোজিত হওয়ার দাবি রাখে। বইয়ের ভূমিকা মারফত লেখক আমাদের জানাচ্ছেন, ‘আমার স্মৃতিকথার এই তৃতীয় খণ্ডে আমি শুধু একাত্তরের কাহিনিই লিখতে বসেছি। তবে তাতে ১৯৭২ সালের স্মৃতিও স্থান পাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধকালে আমি ছিলাম সুদূর আমেরিকায় পাকিস্তান দূতাবাসে ওয়াশিংটনে পদায়িত অর্থনৈতিক কাউন্সেলর। ৩০ জুন সেখানে পাকিস্তান দূতাবাস পরিত্যাগ করে আমি চূড়ান্তভাবে সরাসরি বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধ করতে ব্রতী হই। সে যুদ্ধ কিন্তু অস্ত্রশস্ত্র হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ ছিল না। সে ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সফল করার জন্য বিশ্ব জনমত সৃষ্টির প্রয়াস এবং পাকিস্তানকে জব্দ করার জন্য সে দেশের প্রতি আন্তর্জাতিক ঘৃণা ও অসহযোগিতা উদ্রেক করা। সেই উদ্যোগে সহযোগী হন প্রবাসে অবস্থানকারী বাঙালি জনগণ, বন্ধুদেশ ভারতের ডায়াসাপোরা এবং সংবেদনশীল মার্কিন জনগণ। সংবাদমাধ্যম, বুদ্ধিজীবীবৃন্দ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যুবক, কিশোর ও শিক্ষকবৃন্দ এবং অসংখ্য বিবেকতাড়িত মানবতাবাদী সাধারণ মানুষ এতে মূল্যবান অবদান রাখেন।’

এই বই রচনার পটভূমি এবং তার বিস্তৃতি কতটা গভীর, সে সম্পর্কে পাঠককে প্রাথমিক ধারণা দেওয়ার জন্যই লেখকের ভূমিকা থেকে এই দীর্ঘ উদ্ধৃতি তুলে ধরা হলো। আমরা এ বইয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায় থেকে জানব যে লেখক উড়ে এসে জুড়ে বসা গোছের কেউ নন। তাঁর ব্যক্তিক পটভূমি আছে—রাজনৈতিক ও সামাজিক—দুই ক্ষেত্রেই। জানাচ্ছেন, ‘১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান হলো, আমি তখন নবম শ্রেণির ছাত্র—একটি রাজনৈতিক পরিবারের ছেলে এবং নিজেও বেশ সক্রিয়।’ আরও জানাচ্ছেন, ‘পাকিস্তান নিয়ে আমাদের কত স্বপ্ন।...কিন্তু সেই স্বপ্ন ছিল খুব স্বল্পস্থায়ী।’

লেখক তাঁর ছাত্রজীবনে যে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, সে কথা বলার পাশাপাশি তুলে ধরেছেন পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যকার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও ভাষার প্রশ্নে টানাপোড়েন ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কথা অকপটে। আমরা দেখি নিজের জন্মশহরে থাকতে তিনি যেমন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়, তেমনি ঢাকায় এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন-পর্যায়ের জীবনেও একইভাবে সক্রিয়। এ বইয়ে লেখকের স্বদেশের মাটিতে রাজনৈতিক তৎপরতা যেমন উজ্জ্বল রেখায় অঙ্কিত, তেমনি যখন পদস্থ সরকারি পেশাগত জীবনে ঢুকছেন, তাঁর তখনকার জীবনও প্রখর রাজনীতি-মনস্ক। ফলে আবুল মাল আবদুল মুহিত—আগেই বলেছি—শূন্য থেকে ছিটকে পড়া কেউ নন।

পদস্থ চাকরির সুবাদেই মুহিত মহান মুক্তিযুদ্ধের কালপর্বে অবস্থান করছেন সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, যে মহাশক্তিধর দেশটির সরকার আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিল। আর সেই দেশের মাটিতে বসেই তিনি, তাঁর বয়ানে, ‘...চূড়ান্তভাবে সরাসরি বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধ করতে ব্রতী হই।’ এবং আমরা দেখি, আবুল মাল আবদুল মুহিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ মাথা থেকে সে মাথা চষে বেড়াচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে। এ ছিল তাঁর মিশনারিসুলভ তৎপরতা। তাঁর সেই মিশন ব্যর্থ হয়নি। বিভিন্ন স্তরের সাধারণ মার্কিন নাগরিকসহ ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান-নির্বিশেষে সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করছেন। সক্রিয় পদক্ষেপ বা উদ্যোগ নিচ্ছেন তাঁরা। এসবেরই মূলে ছিল মুহিত ও তাঁর মুক্তিযুদ্ধ-সমর্থক সহকর্মী-সহযোগীদের নিরলস ও জানবাজি রাখা উদ্যোগ।

আলোচ্য বইয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে দেশপ্রেমিক বাঙালি সমাজের মুক্তিযুদ্ধের অনুকূলে সক্রিয় তৎপরতার প্রায় বিস্তারিত বিবরণ, পাশাপাশি তাদের প্রভাবে মার্কিন জনগণও যে উদ্দীপ্ত ভূমিকা রেখেছিল মুক্তিসংগ্রামে, আছে সেই সবও। তবে বইটিতে শেষতক আমরা দেখি বিভক্ত মার্কিন সমাজ—যার একদিকে প্রায় একঘরে নিক্সন-কিসিঞ্জার সরকার ও তার অনুগত অনুসারীরা, অন্যদিকে মুক্তমনা, দৃঢ়চেতা সিনেটর, কংগ্রেসম্যান ও বিভিন্নস্তরের মার্কিন জনগণ। ছক কেটে কেটে এসবের সবিস্তার বিবরণ তুলে ধরেছেন লেখক। তাঁকে ধন্যবাদ এমন একটি বই রচনার জন্য, যার বদৌলতে আমরা জানতে পারছি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে মার্কিন সমাজের সামগ্রিক চেহারা ও চরিত্র।

 

তথ্যপ্রযুক্তি

বাজাজ জানিয়েছে, পালসার ১২৫-এর নতুন মডেলের দাম পড়বে ভারতে ৭৯ হাজার ৯১ রুপি। আগের ১২৫ মডেলের ডিস্ক ব্রেকের সঙ্গে এই মডেলের ফারাক বিস্তর। আগের ক্ষেত্রে ছিল ফ্রন্ট সিট ডিস্ক ব্রেক। এবারে তার বদলে থাকছে সিঙ্গেল সিট ডিস্ক ব্রেক। অটোমোবাইল বিশেষজ্ঞদের মতে, সিঙ্গল সিট ডিস্ক ব্রেকের সুবিধা হচ্ছে বালি-কাঁকড় বা ভিজে রাস্তায় ডিস্ক ব্রেক চাপলেও স্কিড করার সম্ভাবনা কম। তাদের ভাষায় সিঙ্গেল সিট ডিস্ক ব্রেক চাকাকে মাটির সঙ্গে কামড়ে ধরে রাখতে সাহায্য করে। তিনটি রঙের কম্বিনেশন হবে নতুন পালসার ১২৫। এগুলো হলো- নিয়ন-ব্ল্যাক, ব্ল্যাক-সিলভার এবং ব্ল্যাক-রেড। এ নতুন বিএস৬ পালসার-১২৫ মডেলে হেড লাইটের অংশটি দেখতে হবে নেকড়ের চোখের মতো। টুইন পাইলট ল্যাম্পের সঙ্গে থাকবে টুইন স্ট্রিপ এলইডি ল্যাম্প। যা অন্ধকার রাস্তায় অনেক দূর পর্যন্ত দৃশ্যমানতা তৈরি করবে। এখানেই শেষ নয়। এর সঙ্গে থাকবে ৩১ মিলিমিটার টেলিস্কোপ ফ্রন্ট ফর্কস, দুটি গ্যাস শক করার অ্যাবজর্বার। চাকার মাপ ১৭ ইঞ্চি। এই মোটর সাইকেলে যে ডিটিএসআই ইঞ্জিন ব্যবহার করা হবে তা থেকে ১১.৬ বিএইচপি @ ৮৫০০ আরপিএম উৎপন্ন করবে। ১০.৮এনএম টর্ক @ ৬৫০আরপিএম পাওয়া যাবে। যার ফলে গতিও হবে মসৃণ। বাইকটির মোট ওজন হবে ১৪২ কেজি। যা পালসারের যে কোনও মডেলের মধ্যে সর্বোচ্চ। অনেকেই বলেন, লম্বা রাস্তায় যেখানে বেশি গতিতে বাইক চালানো যায় সেখানে বেশি ওজন হলে সুবিধা।

ব্লু হোয়েলফেসবুক সতর্কবার্তা ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই নিজ নিজ বন্ধুদের বিশেষ বার্তা পাঠাচ্ছেন: সাবধান, বাংলাদেশেও পৌঁছে গেছে ব্লু হোয়েল গেম! এ নিয়ে অনেকেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন। অনেকে কৌতূহল থেকে জানতে চাইছেন পুরো ব্যাপারটা। কেউ কেউ আতঙ্কও ছড়াচ্ছেন।

আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে সতর্ক অবশ্যই থাকা উচিত। বিশেষ করে উঠতি বয়সীদের দিকে খেয়াল রাখা, ‘দেখি কী হয়’-এর কৌতূহল অনেক সময়ই যাদের নিয়ে যায় ভুল পথে। এ কারণে সচেতনতা বেশি জরুরি। ভুল তথ্য প্রচার বা গুজব রটানো উল্টো এই গেমটির প্রচারণায় বেশি সাহায্য করবে। ফলে, সঠিক তথ্য জেনে রাখাটাই বেশি দরকার।

ব্লু হোয়েল গেম খেলে হলিক্রসের একটি মেয়ে আত্মহত্যা করেছে—এমন একটি গুঞ্জনের কারণে ফেসবুক বেশ সরগরম। বাংলাদেশের কয়েকটি পত্রিকাও এমন খবর দিয়েছে। যদিও প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আহমেদ জায়িফ তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‌‘ব্লু হোয়েল গেমস খেলে হলিক্রসের মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে বলে যে খবর চাউর হয়েছে, তার এখন পর্যন্ত কোনো ভিত্তি নেই। মেয়েটার শরীরে ব্লু হোয়েলের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তার আত্মহত্যার ধরনটিও আরও আট-দশটা আত্মহত্যার ঘটনার মতোই। মেয়েটির বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, তাঁরা তাকে ভয়ানক রকম নজরদারির মধ্যে রেখেছিলেন। অহেতুক সন্দেহ করতেন। বাবা-মায়ের সঙ্গে তার ব্যক্তিত্বের বড় ধরনের দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় হয়তো ঘটনাটি ঘটেছে। কে জানে, বাবা-মাও হয়তো বিষয়টি বুঝতে পারছেন। কিন্তু এখন ব্লু হোয়েল গেমে সান্ত্বনা খুঁজছেন!’

ঘাতক এই গেমের কারণে অবশ্য বিশ্বজুড়ে বেশ কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেই একটি আত্মহত্যার ঘটনায় মামলা গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। ভারতীয় প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রর নেতৃত্বে গড়া বেঞ্চ সেই মামলা পরিচালনা করছেন। আইনজীবী সি আর জয় সুকিন আরজি জানান, অনলাইনে যেন এই গেম পাওয়া না যায় এবং এই গেমের খেলার ওপর সরকার যেন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কারণ, এই গেমটি মানুষকে আত্মহত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করে। এটি এমন কিছু ডেয়ার বা চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করে, যা পরে খেলোয়াড়ের আত্মহত্যায় পরিণতি নেয়।

বাংলাদেশেও পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই। এ রকম ঘৃণ্য একটি গেমের নেশায় যেন কিছুতেই না পড়ে এ দেশের শিশু-কিশোর কিংবা তরুণেরা। পারিবারিক ও বন্ধু মহলে সচেতনতা তৈরি জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি তরফেও উদ্যোগ জরুরি। এ গেম যেন কিছুতেই পাওয়া না যায় বাংলাদেশে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। কৌতূহলে কোনো ধরনের নেশার ফাঁদে পা দেওয়া মস্ত বড় ভুল। সেটা গেমের নেশাও হতে পারে।

 

যুক্তরাজ্য সরকারের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন দপ্তরের অর্থায়নে বিজনেস ফাইন্যান্স ফর দ্য পুর ইন বাংলাদেশ (বিএফপিবি), সিস্টেমস সল্যুশনস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট টেকনোলজিস লিমিটেডের (এসএসডিটেক) নেতৃত্বে একটি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি করেছে। এসএসডিটেক, মাইন্ড ইনিশিয়েটিভস এবং ই-ক্যুরিয়ার একসঙ্গে ছোট ছোট ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের জন্য আর্থিক ও আউটসোর্সিং সহায়তা দেবে। সম্প্রতি ঢাকায় এসএসডি-টেকের কার্যালয়ে চুক্তিপত্র সম্পাদন করা হয়। চুক্তিপত্রে সই করেন বিএফপিবির পক্ষে নাথান অ্যাসোসিয়েটস লন্ডনের বুদ্ধিকা সামারাসিংহে ও এসএসডি টেকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মেহেদী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিএফপিবির দলনেতা ক্রিস অগাস্ট, এসএসডিটেকের চেয়ারম্যান মাহবুবুল মতিন, মাইন্ড ইনিশিয়েটিভসের পরিচালক মো. হারুন আল-রশিদ, ই-ক্যুরিয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিপ্লব জি রাহুলসহ অনেকে।
বিজ্ঞপ্তি

ওয়েব ডিজাইন কি?

ওয়েব ডিজাইন মানে হচ্ছে একটা ওয়েবসাইট দেখতে কেমন হবে বা এর সাধারন রূপ কেমন হবে তা নির্ধারণ করা। ওয়েব ডিজাইনার হিসেবে আপনার কাজ হবে একটা পূর্ণাঙ্গ ওয়েব সাইটের টেম্পলেট বানানো। যেমন ধরুন এটার লেয়াউট কেমন হবে। হেডারে কোথায় মেনু থাকবে, সাইডবার হবে কিনা, ইমেজগুলো কিভাবে প্রদর্শন করবে ইত্যাদি। ভিন্ন ভাবে বলতে গেলে ওয়েবসাইটের তথ্য কি হবে এবং কোথায় জমা থাকবে এগুলো চিন্তা না করে, তথ্যগুলো কিভাবে দেখানো হবে সেটা নির্ধারণ করাই হচ্ছে ওয়েব ডিজাইনার এর কাজ। আর এই ডিজাইন নির্ধারণ করতে ব্যাবহার করতে হবে কিছু প্রোগ্রামিং, স্ক্রিপ্টিং ল্যাঙ্গুয়েজ এবং মার্কআপ ল্যাঙ্গুয়েজ।

 

কেন শিখবেন ওয়েব ডিজাইন?

আমাদের দেশে মূলত লোকজন ‘কোন কাজটা আমি শিখবো’ বা ‘আমি কোন কাজটা পারবো’ এধরনের প্রশ্ন না করে বরং বলে ‘কিভাবে সহজে আয় করবো’ বা ‘এটা শিখে কত টাকা আয় করবো’। যারা আয় কত করবেন বা রাতারাতি কিভাবে আয় করবেন এইসব চিন্তা করেন তাদের জন্য ওয়েব ডিজাইন নয়। যদিও ওয়েব ডিজাইন আসলে উচ্চ আয়ের পেশার মধ্যে অন্যতম কিন্তু আপনি যদি আয়ের কথাটাই মাথায় রেখে এগুতে চান তাহলে আমি বলবো আপনার জন্য ওয়েব ডিজাইন নয়। ওয়েব ডিজাইন, গ্রাফিক ডিজাইন বা প্রোগ্রামিং এই ধরনের পেশা আসলে তাদের জন্য যারা ক্রিয়েটিভ কিছু করতে চান এবং নিজের কাজের মধ্যেই নিজেকে খুজে পেতে চান। ওয়েব ডিজাইন যেহেতু কোডিং এবং প্রোগ্রামিং এ ভরপুর আর প্রোগ্রামিং-এর নেশা ছাড়া প্রোগ্রামিং করা সম্ভব নয় তাই এধরনের কাজ শুধুমাত্র তাদের জন্য যারা এই কাজের প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে শিখে যাওয়ার পর আপনি অন্য যেকোনো পেশা থেকে এখানেই ভালো আয় করতে পারবেন।

 

কি কি শিখতে হবে?

ওয়েব ডিজাইন বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতের উপর নির্ভর করে মোটামুটি কয়েক ধরনের ল্যাঙ্গুয়েজ এবং স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করে করা হয়ে থাকে আবার শুরুতে ফটোশপ ব্যাবহার করে প্রথমে এটার ঘটন নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এদের মধ্যে বহুল ব্যবহৃত গুলো নিচে আলোচনা করা হল –

এইচটিএমএল (HTML): HTML একটি মার্কআপ ভাষা। ব্রাউজার কোন একটা সাইটের ভিউয়ার যা দেখতে পায় তা এইচটিএমএল দিয়ে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এটি কোন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ নয়, বরং যেকোনো প্রোগ্রামিং থেকে অনেক সহজ। এটা এতটাই সহজ যে যেকোনো সাধারন মানুষ যে প্রোগ্রামিং শিখতে চায় না, সেও হাসির ছলে ছলে HTML শিখে নিতে পারে। যেমন আমরা যদি কোন একটা প্যারাগ্রাপ প্রদর্শন করতে চাই তখন এমন লিখতে হয়।

 

ফটো গ্যালারি

ভিডিও গ্যালারি

ভ্রমণ

মুন থাংয়ের ডাকে ধড়মড় করে উঠে দেখি ভোর পাঁচটা। এত তাড়াতাড়ি রাতটা পার হয়ে যাবে ভাবতেই পারিনি। পাহাড়িদের কাঠের ঘরে এত আয়েশ করে ঘুমালাম যে আগের দিনের পাঁচ ঘণ্টা হাঁটার ধকল রাতের মধ্যেই শেষ। বেথেল পাড়া থেকে আরথাহ পাড়া। আঁকাবাঁকা পথ ধরে কয়েকটি পাহাড় ডিঙিয়ে যখন পৌঁছাই প্রায় আড়াই হাজার ফুট ওপরের আরথাহ পাড়ায়, তখন চলছে সন্ধ্যার আয়োজন। রাতে লালচন সাং বমের বাড়িতে থাকার বন্দোবস্ত করে রেখেছিলেন আমাদের গাইড মুন থাং। জায়গাটা বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলায়। 

হাঁটাপথ ধরেই শুরু হলো আমাদের তিনাপের মূল অভিযান। উপত্যকায় মেঘের আনাগোনা বেশ। পাহাড় থেকে আমরা কেবল নিচের দিকে নামছি আর নামছি। গাছপালা আর জঙ্গলে ঘেরা পথ। পাহাড়ি ঢালে জুমের খেতগুলো অসাধারণ দেখতে। সামনে বড় লুংমাই চাং পাহাড় আর দূরে সিপ্পি পাহাড় হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদের। তবে আমরা যাচ্ছি পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে থাকা কোনো এক ঝরনার খোঁজে।
ঘণ্টাখানেক নামার পর দেখা পেলাম বহতা এক খালের। ভরা বৃষ্টির সময় এ খাল ভয়াবহ রূপ ধারণ করে সন্দেহ নেই। পাথুরে খালে স্বচ্ছ পানির প্রবাহ দেখতে দারুণ! কোমরপানি মাড়িয়ে খাল ধরে হাঁটতে হলো বেশ কিছুক্ষণ। খাল পার হতে গিয়ে এক জায়গায় পড়লাম চ্যালেঞ্জের মুখে। অবশেষে বাঁশ সংগ্রহ করে পানির ওপর ফেলে পার হতে হলো ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাটি। এরপর আরেকটি পাহাড় বেয়ে নামার পালা। এখানে নামতে হয় রশি ধরে। খাড়া একটা পাহাড়ি ঢাল। সে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতেই ঝরনার গুঞ্জন কানে এল। এ কোন ঝরনা! সামনে তার বিশাল বিশাল পাথর পড়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। কাছে এসে মনে হলো কোনো আদিম ও বুনো জায়গায় এসে উপস্থিত হলাম আমরা। অসাধারণ পানি পড়ার ছন্দ। একদিকে উঁচু পাথুরে পাহাড়। পাহাড়ের গা ঘেঁষে এ ঝরনা। এই খাল ধরে যেতে হয় তিনাপ ঝরনায়এখানে সাবধানে চলাচল না করলেই বিপদ। মুন থাংকে অনুসরণ করে পা টিপে টিপে হাঁটতে হলো ঝরনা এলাকায়। পাথরগুলো অনেক পিচ্ছিল। এই তিনাপ ঝরনা অনেকটাই বুনো। তিনাপ নামে একধরনের পোকার বসবাস এই ঝরনার পানিতে। তবে সব সময় এদের দেখা মেলে না। এই পোকার নামেই ঝরনাটি পরিচিতি পেয়েছে।
রুমা আর রোয়াংছড়ি উপজেলার সীমানায় এ ঝরনায় কিছু উৎসাহী পর্যটকের আনাগোনা বাড়ছে এক বছর থেকে। আমরা এমন এক সকালে তিনাপে গিয়ে পৌঁছলাম, চারদিকে অভাবনীয় ঝলমলে পরিবেশ। কেবল আমরাই যেন তিনাপকে আলিঙ্গন করতে এসেছি। ঘণ্টাখানেকের মতো থেকে, নির্মল স্বচ্ছ পানিতে গোসল করে ফেরার পথ ধরতে হলো আমাদের। আবার সেই পাইন্দু খাল পাড়ি দিতে হবে। উঠতে হবে ২ হাজার ৫০০ ফুট ওপরের আরথাহ পাড়ায়।

যেভাবে যাবেন
বান্দরবান শহর থেকে রোয়াংছড়ি উপজেলা। তারপর সেখান থেকে গাইড নিয়ে রনিন পাড়া হয়ে তিনাপ সাইতার (ঝরনা)। এ পথ দিয়ে তিনাপ ভ্রমণ সম্পন্ন করতে লাগে তিন দিন। আর বান্দরবান শহর থেকে রুমা উপজেলার বেথেল পাড়া হয়ে আরথাহ পাড়া দিয়ে গেলে দুই দিন লাগে।

 

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়ের পার্শ্ববর্তী মায়াবী ঝরনা। ভারত থেকে নেমে আসা ঝরনার পানি টিলা বেয়ে বাংলাদেশ অংশে পড়ছে। আর সেই পানিতে হই-হুল্লোড় করছেন হাজারো পর্যটক। এবার অধিকাংশ পর্যটকের কাছে নতুন আবিষ্কৃত এ মায়াবী ঝরনা ঘিরেই বেশি আকর্ষণ দেখা যাচ্ছে।

আজ রোববার সকালে মায়াবী ঝরনা উপভোগ করতে সপরিবার সেখানে গিয়েছেন ঢাকার ফার্মগেট এলাকার বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী বেলাল আহমদ। বেলা পৌনে তিনটায় তিনি মোবাইলে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঈদের বন্ধের ঠিক আগে আগেই মায়াবী ঝরনার বিষয়টি আমার মেয়ের মাধ্যমে জানতে পারি। নতুন আবিষ্কৃত এই পর্যটন স্পটটি দেখার জন্যই ছুটি কাটাতে আমরা সিলেটে এসেছি। এখন স্পটটি দেখে সত্যিই খুব ভালো লাগছে।’
বেলালের মতো আরও অনেক পর্যটক মায়াবী ঝরনা ঘিরে ভিড় জমিয়েছেন। তাঁরা ঝরনাটি উপভোগ করার পাশপাশি পার্শ্ববর্তী জাফলং, খাসিপুঞ্জি, তামাবিল পয়েন্ট ও শ্রীপুর পর্যটন স্পটও দেখছেন। এ ছাড়া টিলার ওপর আকাশে মেঘেদের ওড়াওড়িও মানুষ প্রাণভরে উপভোগ করছেন। স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, ঈদুল আজহায় পর্যটকেরা সাধারণত বেড়াতে আসেন ঈদের দুদিন পর। এ ক্ষেত্রে আগামীকাল সোমবার থেকে পর্যটকদের ভিড় বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিছনাকান্দিতে ভিড় করেছেন পর্যটকেরা। ছবি: আনিস মাহমুদআজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যটন স্পট ঘুরে দেখা গেছে, কেবল মায়াবী ঝরনা আর জাফলং ঘিরেই পর্যটকদের ভিড় ছিল না, অন্যান্য পর্যটন স্পটেও পর্যটকেরা ভিড় করেছেন। সবচেয়ে বেশি ভিড় ছিল জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত জলারবন খ্যাত রাতারগুল এবং জল-পাথরের শয্যাখ্যাত বিছনাকান্দিতে। এ দুটি পর্যটন স্পটে সাম্প্রতিক সময়ে ঈদের বন্ধে বরাবরই প্রচুর পর্যটকের ভিড় জমে। ব্যতিক্রম হয়নি এবারও। ছুটি কাটাতে তাই মানুষের ঢল নেমেছে এসব পর্যটন স্পটে। এর বাইরে জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ হাকালুকি হাওর ঘিরেও ছিল পর্যটকদের ভিড়।
সিলেট নগরের জিন্দাবাজার এলাকার গোল্ডেন সিটি হোটেলের ব্যবস্থাপক মিষ্টু দত্ত বলেন, ‘অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার তুলনামূলকভাবে পর্যটকের উপস্থিতি কম। মূলত বৈরী আবহাওয়া, বন্যা এবং সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রিক রাস্তাগুলো বিধ্বস্ত থাকার কারণে পর্যটকেরা খুব একটা আসেননি। এর ফলে আমাদের হোটেলের অধিকাংশ কক্ষ এখনো ফাঁকাই রয়ে গেছে।’ তবে তিনি এও জানান, ঈদুল আজহায় পর্যটকেরা মূলত ঈদের দু-তিন পরে ভিড় জমান। সে ক্ষেত্রে আগামীকাল কিংবা পরশুর ভেতর পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়বে বলে তাঁর প্রত্যাশা।
বিছনাকান্দিতে আসা পর্যটকদের সেলফি তোলার ধুম। ছবি: আনিস মাহমুদসিলেটের জেলা প্রশাসক মো. রাহাত আনোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেহেতু জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলায় মায়াবী ঝরনা, জাফলং, রাতারগুল ও বিছনাকান্দি ঘিরেই পর্যটকদের ভিড় বেশি হয়, তাই সেসব এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’ জেলা প্রশাসক বলেন, ‘পর্যটকদের সুবিধার জন্য যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে রাখা হয়েছে লাইফজ্যাকেটও। এ ছাড়া ফেঞ্চুগঞ্জের হাকালুকি হাওরেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রিক এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন সার্বক্ষণিক তৎপর রয়েছে।’