ঢাকা, , ২৯ নভেম্বর, ২০২০

পোশাকশিল্পের মালিকেরা অস্বস্তিতে ছিলেন

টাইমসনিউজটোয়েন্টিফোর.কম

Saturday,28 October 17 04:35:08

মাহমুদ হাসান খান: স্বস্তি বা অস্বস্তি নয়, বিষয়টি হচ্ছে বাংলাদেশে পোশাকশিল্পটা আমরা উদ্যোক্তারাই গড়ে তুলেছি। বিভিন্ন সময় যে চ্যালেঞ্জ এসেছে, সেগুলো আমরা নিজেরাই মোকাবিলা করেছি। যেমন: শিশুশ্রম বন্ধ করেছি। রানা প্লাজা ধসের পর আমরা দেখলাম কারখানার কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়ে অনেক পিছিয়ে আছি। তার আগে কারখানার বৈদ্যুতিক ও অগ্নিবিষয়ক নিরাপত্তার কিছু বিষয় দেখা হতো। তবে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে কিছুই করা হয়নি। তো, অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স গঠনের পর পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা মনে করেছিলেন, তারা মূলত নিরাপত্তার বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করবে। সেটিই তারা করছিল। তবে পরে দেখা গেল, অনেক ছোটখাটো বিষয় অনেক বড় করে আনা হচ্ছে। তখনই মালিকদের মধ্যে অস্বস্তির বিষয় এসেছে। তবে অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্স চলে গেলেই যে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে কারও কারও জন্য অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হবে না, সেটি নিশ্চিত করে বলা যাবে না। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, আজ হোক কাল হোক জোটের দায়িত্ব আমাদের দেশকে নিতেই হবে। আবার শতভাগ কাজ করে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স চলে যাবে, এমন ভাবনাও ভুল। কারণ অ্যাকর্ডের অধীনে প্রতি মাসে নতুন কারখানা যুক্ত হচ্ছে। পুরোনো যেসব কারখানার সংস্কারকাজ শেষ হয়েছে, সেখানেও সম্প্রসারণ হচ্ছে। তাহলে তো কাজ কখনোই শেষ হবে না। সে জন্য ৯০ কিংবা ৯৫ শতাংশ সংস্কারকাজ হয়ে যাওয়ার পরই দায়িত্ব বুঝে নিতে হবে। তাই আমরা মনে করছি, যত তাড়াতাড়ি কাজগুলো করা যাবে, ততই মঙ্গল।

প্রথম আলো: আপনি বললেন, অ্যাকর্ড অনেক ছোটখাটো বিষয় বড় করে আনায় মালিকদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। সেই বিষয়গুলো কী?

মাহমুদ হাসান খান: সরাসরি নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত নয় এমন কিছু বিষয় বড় করে নিয়ে আসে অ্যাকর্ড। যেমন: গ্রুপ অব কোম্পানির আইনগত কোনো ভিত্তি না থাকলেও একটি কারখানা সংস্কারকাজে ব্যর্থ হলে বাকিদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করে তারা। আবার সংস্কারকাজের জন্য অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ করেছে। তারা অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের সরঞ্জামও গছিয়ে দেয়। কিন্তু সে জন্য কারখানার মালিককে দায়ী করে তাঁর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করা হচ্ছে। আমরা বারবার বলেছি, কোনো কারখানার ফলোআপ পরিদর্শনে যেন একই প্রকৌশলী আসেন। কিন্তু প্রতিবারই নতুন প্রকৌশলী পাঠানো হয়। পরিদর্শন করে তাঁরা নতুন নতুন ত্রুটি চিহ্নিত করে সংশোধন করতে বলেন। শ্রম অধিকার নিয়ে কোনো শ্রমিকনেতা অ্যাকর্ডের কাছে অভিযোগ করলে সেটি তারা নিরাপত্তা ইস্যুতে রূপান্তর করে কারখানা কর্তৃপক্ষকে তলব করত। তবে শ্রম অধিকার দেখার জন্য শ্রম মন্ত্রণালয় আছে। অ্যাকর্ড তাদের মূলনীতির বাইরে কাজটি করত। এসব অনেক কারণ নিয়ে মালিকেরা অস্বস্তিতে ছিলেন।

প্রথম আলো: অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের দায়িত্ব বুঝে নেবে জাতীয় ত্রিপক্ষীয় কর্মপরিকল্পনার অধীনে (এনটিএপি) গঠিত রেমিডিয়েশন কো-অর্ডিনেশন সেল বা আরসিসি। গত মে মাসে আরসিসির উদ্বোধন হলেও কাজ শুরু করতে পারেনি। তাহলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কি আরসিসি সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে? কী ধরনের সক্ষমতা লাগবে সেটি পরিষ্কার?

মাহমুদ হাসান খান: আরসিসি গঠনপ্রক্রিয়া শেষ। জানুয়ারিতে বাস্তবায়ন শুরু হবে। এনটিএপির অধীনে থাকা কারখানার সংখ্যা শেষ পর্যন্ত ৬০০-৭০০-এর বেশি হবে না। অনেক কারখানা বন্ধ কিংবা স্থানান্তর হয়ে গেছে। সচল কারখানাগুলো ত্রুটি সংশোধন কর্মপরিকল্পনা (ক্যাপ) আগেই জমা দিয়েছে। কেউ কেউ নিজের উদ্যোগে সংস্কারকাজও শুরু করেছে। আরসিসি জানুয়ারিতে কাজ শুরু করলে পাঁচ মাস সময় পাওয়া যাবে। এই সময়ের মধ্যে সক্ষমতা অর্জন হবে না ধরে নিয়েই কিন্তু অ্যাকর্ডের মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানোর চিন্তা করা হয়েছে। অ্যালায়েন্স আগেই বলেছে কার্যক্রম গোটাতে তাদের ছয় মাস সময় বেশি লাগবে। তার মানে ১১ মাস পাচ্ছে আরসিসি। দায়িত্বশীল হলে তার আগেই প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সম্ভব। মূলত কারিগরি দিক দিয়ে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। আইএলওর সহায়তায় আরসিসি করছে শ্রম মন্ত্রণালয়। এই সেলের কাজ হবে ক্যাপ ও ডিইএ (ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট) যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দেওয়া এবং সংস্কারকাজ তদারকি করা। সে জন্য প্রকৌশলীদের দলটি খুবই শক্তিশালী হতে হবে। আশার কথা হচ্ছে, যাঁরা আরসিসিতে নিয়োগ পাচ্ছেন, তাঁদের অধিকাংশেরই অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে।

প্রথম আলো: কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের অধীনে থাকা কারখানাগুলো গত প্রায় দুই বছরে সংস্কারকাজে সদিচ্ছা দেখায়নি। কিন্তু এখান অগ্রগতি দেখাতে না পারলে অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের দায়িত্ব বুঝে নিতে বেগ পেতে হবে। আপনি কীভাবে আশা করছেন, পাঁচ মাসের মধ্যে পিছিয়ে থাকা কারখানাগুলো অনেক অগ্রগতি করে ফেলবে?

মাহমুদ হাসান খান: সদিচ্ছার পাশাপাশি ক্ষমতাও থাকতে হবে। এনটিএপির অধীনে থাকা কারখানাগুলো বড় ব্র্যান্ডের কাজ করে না। তাদের আর্থিক অবস্থা দুর্বল। কিন্তু এসব কারখানার প্রাথমিক পরিদর্শন শেষ হয়েছে। ক্রেতাদের দুই জোটের মতো এনটিএপির অধীনে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাহলে বাকিগুলো নিরাপদ। কেবলমাত্র কারখানাগুলোর মান উন্নত করতে হবে। সংস্কারকাজের জন্য আর্থিক সক্ষমতা কম থাকার কারণে লম্বা সময় পাচ্ছে তারা। আইএফসি ও জাইকার ঋণ অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের কোনো কারখানা পায়নি। সেহেতু এনটিএপির কারখানাগুলো পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আরেকটি কথা, কারও যদি সদিচ্ছার অভাব থাকে তাহলে উনি এই শিল্পে থাকতে পারবেন না।

প্রথম আলো: রানা প্লাজা ধসের পর যা অগ্রগতি হয়েছে তার অধিকাংশই চাপের মুখে। সংস্কারকাজে পিছিয়ে থাকা কারখানাগুলোকে চাপে রাখার কোনো পরিকল্পনা আছে?

মাহমুদ হাসান খান: আরসিসির গঠনপ্রক্রিয়া ও অর্থায়ন নিয়েই সময়ক্ষেপণ হয়েছে। যখন কাজ শুরু হবে, তখন কারখানাগুলো চাপে পড়ে যাব। বিজিএমইএ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যারা সংস্কারকাজ শেষ করবে না, তাদের সদস্যপদ নবায়ন করা হবে না। কারণ, কোনো কারখানায় দুর্ঘটনা ঘটলে সেটির দায়ভার কিন্তু পুরো পোশাকশিল্পের ওপর এসে পড়বে। সুতরাং আরসিসি গঠনপ্রক্রিয়া শেষ হলেই আমরা তাদের চাপে রাখব।

প্রথম আলো: অ্যাকর্ডের মেয়াদ ছয় মাস বাড়বে। সেটিকে আপনারা অন্তর্বর্তীকালীন অ্যাকর্ড বলছেন। তখন পুরোনো নাকি অ্যাকর্ডের ঘোষিত নতুন নিয়মকানুন প্রযোজ্য হবে?

মাহমুদ হাসান খান: স্টিয়ারিং কমিটির সঙ্গে আমাদের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়নি। পরবর্তী বৈঠকে আলোচনা হবে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে পূর্ববর্তী নিয়মকানুনই প্রযোজ্য হবে। সে জন্যই এটি অন্তর্বর্তীকালীন। না হলে তো নতুন অ্যাকর্ড বা সংস্করণ হতো। আসছে নভেম্বরে পাঁচ সদস্যের তদারকি কমিটির প্রথম বৈঠকে আমরা বিষয়টি আলোচনা করে ঠিক করে নেব।

পাঠকের মন্তব্য