ঢাকা, , ২৯ নভেম্বর, ২০২০

কাইফি-শওকত প্রেমগাথা

টাইমসনিউজটোয়েন্টিফোর.কম

Saturday,28 October 17 03:44:17

উর্দু কবি কাইফি আজমির গ্রামে ইংরেজরা চাইল নীলচাষ করতে। কাইফির দাদা বুদ্ধি বের করলেন, বীজ ফুটিয়ে জমিতে লাগাবেন। ইংরেজরা তাহলে মনে করবে, এ জমি নিষ্ফলা। আর এভাবে নীলচাষের কবল থেকে মুক্তি পাবে গ্রাম।

দাদা যা ভাবলেন, তা-ই করলেন। তাঁর দেখাদেখি গ্রামবাসীও একই কাজ করলেন। কিন্তু ইংরেজরা একসময় টের পেয়ে গেল। কাইফির দাদার নামে মামলা করল, কিন্তু ইংরেজরা গ্রামে আর নীলচাষ করল না। কাইফি পরে বলেছেন, দাদা জমিতে ইংরেজদের জন্য যে ঘৃণার বীজ বুনেছিলেন, সেটাই কাইফির মনে পরে গাছ হয়ে জন্মেছিল।

বিখ্যাত ভারতীয় গীতিকবি জাভেদ আখতার কাইফি আজমির বয়ানে ঘটনাটি বলছিলেন গতকাল সন্ধ্যায়। ব্লুজ কমিউনিকেশনসের ব্যবস্থাপনায় ‘কাইফি অউর ম্যায়’ অনুষ্ঠানটি হয় রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ কমপ্লেক্স মিলনায়তনে।

কাইফি অউর ম্যায় কবি কাইফি আজমি ও তাঁর স্ত্রী শওকত কাইফির প্রেমগাথা। আছে কাইফি আজমির সংগ্রামী জীবনের কথাও। শওকত কাইফির জীবনী ‘ইয়াদ কি রেহেগুজার’ এবং কাইফি আজমির বিভিন্ন লেখা ও সাক্ষাৎকার থেকে এই মঞ্চ পরিবেশনাটি তৈরি করেছেন জাভেদ আখতার। পরিবেশনায় কাইফির অংশটি পাঠাভিনয় করে দেখান জাভেদ আখতার। আর শওকতের অংশটি করেন কাইফি-শওকতের কন্যা শাবানা আজমি।

কাইফি আজমির সঙ্গে শওকত কাইফির প্রথম সাক্ষাতের ঘটনাটা খুব মজার। শাবানা তাঁর মা শওকতের বয়ানে বললেন ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের কথা। ভাইয়ের সঙ্গে কবিতাপাঠের আসরে গেছেন শওকত। সেখানে কাইফির কবিতা শুনে মুগ্ধ শওকত। নজর আর সরেই না।

এভাবেই শুরু হয় কাইফি-শওকতের প্রেমকাহিনি। দুজনের বিয়েই ঠিক হয়েছিল। তবু কীভাবে ভাইদের বিরুদ্ধে গিয়ে শওকত প্রেম করেছিলেন চালচুলোহীন তরুণ কবি কাইফির সঙ্গে, শওকতের বাবা কীভাবে রাজি হলেন এই বিয়েতে, মুম্বাইয়ে কাইফি-শওকতের দিনগুলো—একে একে এসবের বর্ণনা দিয়ে চলছিলেন জাভেদ-শাবানা।

৫৫ বছরের সংসারের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে কাইফি আজমির রাজনৈতিক জীবনও। স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতে কাইফির সংগ্রামের কথা এল। একসময় স্বাধীনতা এল, কিন্তু রক্তের বন্যা থামল না। একসময় স্বাধীন দেশে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হলো, কাইফি আত্মগোপন করলেন। এ সময় শাবানা এলেন শওকতের গর্ভে। দল এ সন্তান নষ্ট করে দিতে বলল, কিন্তু শওকতের দৃঢ় সিদ্ধান্তে শাবানা জন্ম নিল।

কাইফি চলচ্চিত্রের গান লেখা শুরু করলেন। গান তো হিট হলো, কিন্তু ছবিগুলো ফ্লপ হচ্ছে। সবাই কাইফিকে অপয়া ভাবতে লাগলেন। একদিন চেতন আনন্দ এসে কাইফিকে আবার গান লিখতে বলেন। চেতন আনন্দের হাকিকত ছবিটি হিট হলো। সে ছবির গান লিখলেন কাইফি আজমি, সুর দিলেন মদন মোহন। চেতন, কাইফি ও মদন মিলে একের পর এক হিট ছবি উপহার দিতে লাগলেন।

গজলশিল্পী জসবিন্দর সিং মাঝেমধ্যে গাইলেন কাইফি আজমির লেখা গজল ও গান, ‘ইতনা তো জিন্দেগি’, ‘ঝুকে ঝুকে সি নজর’, ‘ইতনে বাজু ইতনে সার’, ‘তেরে শহর মে’। কাইফির লেখা বলিউড ছবির গানও গাইলেন জসবিন্দর, ‘তুম জো মিল গ্যায়ে হো’ (‘হাসতে জখম’), ‘আব তুমহারে হাওয়ালে ওয়াতন সাথিয়ো’ (‘হাকিকত’), ‘ওয়াক্ত নে কিয়া ক্যায়া হাসি সিতম’ (‘কাগজ কে ফুল’), ‘তুম ইতনা জো মুসকুরা রেহে হো’ (‘আর্থ’)।

দুই ঘণ্টা কখন পেরিয়ে গেল, টের পাওয়া গেল না। জসবিন্দরের গজলের সঙ্গে শাবানা আজমি ও জাভেদ আখতারের পাঠাভিনয় পুরো দুই ঘণ্টা মোহিত করে রাখে দর্শক-শ্রোতাদের। কাইফি আজমি ও শওকত কাইফির প্রেমগাথা শেষ হয়। ‘কাইফি অউর ম্যায়’ (কাইফি আর আমি) নাটকের এ অভিজ্ঞতা, দুই কাইফির সঙ্গে এ দুই ঘণ্টা ছিল অনবদ্য।

পাঠকের মন্তব্য