ঢাকা, , ২ ডিসেম্বর, ২০২০

ঘেটুপুত্র শেরেবুল

টাইমসনিউজটোয়েন্টিফোর.কম

Saturday,28 October 17 03:44:13

হলুদ শাড়ি পরে মেকআপ নিচ্ছিল লোকটা। খানিক বাদে আয়না ছেড়ে দিতে হলো, এসে বসল একটি মেয়ে। একটি টুলের ওপর বসিয়ে লোকটির চোখে যত্ন করে কাজল পরিয়ে দিল এক তরুণ, তারপর লম্বা বেণিওয়ালা পরচুলা। এবার ধরার কোনো উপায় রইল না যে শাড়ি-অলংকার-কাজল পরা লোকটা আসলে নারী নন। বাইরে থেকেই নয়, এই বেশ নেওয়ার পর ভেতরেও তাঁকে ধারণ করতে হয় একজন নারীকে। গত সপ্তাহে জাতীয় জাদুঘরের মূল মঞ্চের পেছনে সাজঘরে বসে দেখা এ দৃশ্য।

লোকটির নাম শেরেবুল। ৩২ বছর ধরে নিজের ভেতরে একজন নারীকে ধারণ করে তিনি কাঁদেন ও হাসেন। পালার নায়িকা রূপবান, কাজলরেখা, বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না কিংবা চাঁদ সওদাগর-এর বউ সনকার সুখ-দুঃখগুলো তাঁর হয়ে গেছে। তাঁর দুঃখে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোরের লোকেরা কাঁদেন, তিনি সুখী হলে করতালি দেন। যাত্রাপালার দর্শকেরা ভালোবাসেন তাঁকে।

ঘেটু যাত্রাদলে নাচ-গান-অভিনয় শিখেছেন শেরেবুল। নাচ-গান করে এমন পুরুষ নেই চৌদ্দগুষ্টি। কৃষক বাবার কড়া হুকুম ছিল, ঘরে যেন কোনো কুকথা না আসে। শৈশবে এক যাত্রাদলের প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য মঞ্চে তুলেছিলেন। সেই থেকে মঞ্চে। যাত্রাদলে এখন অনেক নারী শিল্পী কাজ করেন। তাতে শেরেবুলের আবেদন কমেনি। ‘তাঁর মতো ছুকরির নাচ কেউ পারে না’, আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিজের শিষ্য সম্পর্কে কথাটি বলেছেন জেলা শিল্পকলা পদকে ভূষিত শিল্পী রেজাউল হক সলক। তিনি এ-ও বলেন, ‘ওর ডিমান্ড আছে। “নসিমন শেরেবুল” একনামে সবাই চেনে।’ সে জন্য বেশ কিছু দলে কাজ করতে হয় তাঁকে।

নাচ-গান-অভিনয় এই ঘেটুপুত্রদের প্রধান পেশা নয়। শেরেবুল ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালান। কুষ্টিয়ার বহলবাড়ি ইউনিয়নে তাঁদের বাড়ি। সেখানে আছেন তাঁর স্ত্রী ও এক ছেলে। সেদিন মঞ্চের পেছনে তিনি যখন চাঁদ সওদাগরের বউ হতে চেষ্টা করছিলেন, তখন জানতে চাই, ‘এই নাচ শিখলেন কেন?’ তিনি তখন প্রায় চরিত্রে ঢুকে পড়েছেন। বললেন, ‘অনুরাগে শিখেছি। প্রথমবার মঞ্চে উঠলে লোকে হাসছিল, পরে জেদ চেপে গেছে। এখন সবাই আমারে চায়।’

মেয়ে মানুষের মতো কাঁদেন কীভাবে, জানতে চাইলে শেরেবুল শোনান দুঃখ শুষে নেওয়ার উপায়টি। ‘মা-বোনেদের স্বামী মরে গেলে তাঁদের কান্না মন দিয়ে দেখি। সেগুলো ভিতরে রয়ে গেছে। তবে ঝুমুর যাত্রা বা গীতিনাট্যিই করি তা না, গ্রামের যাত্রাপালার নায়ক হই কখনো কখনো। লোকে বলত, এসব করিস ক্যান? আমি বলি, শিখছি বলে করি, লোকেও ছাড়ে না। দেখি কত দিন লোকে চায়।’

শেরেবুলের ২০ বছরের সংসার, ছেলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। সে ‘ঘেটুপুত্র’ হবে না। শেরেবুলের ইচ্ছা, তাঁর এই ধারা ধরে রাখুক কেউ। নারীদের পক্ষে সব নারীর সব অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। একজন নারীকে গভীরভাবে দেখতে পায় একজন পুরুষ। সে জন্য নারীর নাচ ও অভিনয় করা পুরুষের দরকার আছে। তা ছাড়া দীর্ঘ সময়ের যাত্রাপালায় একজন মেয়ের পক্ষে অভিনয় করা ভীষণ কঠিন কাজ। এ নিয়ে শেরেবুলের একটি যুক্তি আছে। তাঁর মতে, নারীকে দিয়ে নারীর গান গাওয়ালে সেটা হয়ে যাবে মডার্ন। কিন্তু বহুকাল আগে থেকে পুরুষই নারীর ভূমিকায় অভিনয় করে আসছে। এটা ঐতিহ্য।

পাঠকের মন্তব্য