ঢাকা, , ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০

আবার তাঁরা মঞ্চে

টাইমসনিউজটোয়েন্টিফোর.কম

Saturday,28 October 17 03:36:44

মগবাজারের আহমেদ পরিবার গলির মাথায় একটি পাঁচতলা ভবন। ভবনের তৃতীয় তলায় আরণ্যক নাট্যদলের মহড়াকক্ষ। মহড়াকক্ষে ঢুকতেই বোঝা গেল, সেখানে সাজ সাজ রব। বেশ সরগরম। ব্যস্ত আজিজুল হাকিম, আমিন আজাদ, হারুনুর রশীদ ও শাহ আলম দুলাল। নাটকের পাণ্ডুলিপি নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। বোঝা গেল, মহড়া এখনো শুরু হয়নি। সবাই অপেক্ষা করছেন নাটকের অন্যান্য কুশীলব ফজলুর রহমান বাবু, তুষার খান, মান্নান হীরা, ফয়েজ জহির এবং মোমেনা চৌধুরীর জন্য। আজ এখানে ইবলিশ নাটকের মহড়া চলবে।

 হঠাৎ ইবলিশ নাটকের মহড়া, দলের জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের আবার মঞ্চে ফেরা—এসব নিয়ে মঞ্চপাড়ায় বেশ আলোচনা। সেই আলোচনার রহস্য উন্মোচন করতেই হাজির হওয়া এখানে। আরণ্যকের জ্যেষ্ঠ কর্মী দিলু মজুমদার জানালেন ২২ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে আরণ্যক নাট্যদলের ৪৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে সাত দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব। এই উৎসবে আরণ্যকের তিনটি পুরাতন নাটক: ইবলিশ, ময়ূরসিংহাসনরাঢ়াঙমঞ্চস্থ হবে। নাটকগুলোতে দেখা যাবে দলের জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের। আর সে জন্য এই প্রস্তুতি ও মহড়া।

 কথা শেষ না হতেই মহড়াকক্ষে ঢুকলেন আরণ্যকের প্রাণপুরুষ মামুনুর রশীদ। সবাই দাঁড়িয়ে গেলেন গুরুর সম্মানে।

 এবার শুরু হলো মহড়া। মজার ব্যাপার হলো, নাটকের পুরো সংলাপ কারও মুখস্থ নেই। তাই একজন আরেকজনের সংলাপ দিয়ে দিচ্ছেন। সংলাপের ভুলের জন্য একজন আরেকজনকে দোষ দিচ্ছেন। এই নিয়ে শুরু হলো হাসিঠাট্টা। সবার হাসিঠাট্টা আর দুষ্টুমি ফিরিয়ে নিয়ে গেল সেই সুদূর অতীতে। স্মৃতিকাতর হয়ে উঠলেন অনেকেই।

আজিজুল হাকিম বললেন, ‘আমরা শুরুর দিকে যখন মহড়ার সময় এ রকম হাসিঠাট্টাই করতাম। আমাদের সবার মধ্যে অদ্ভুত এক হৃদ্যতা কাজ করত। থিয়েটার ছাড়া যেন আর অন্য কোনো ভাবনাই কাজ করত না মনে। দিনের পর দিন রাতের পর রাত একসঙ্গে কাটিয়ে দিতাম সংলাপ, চরিত্র, কস্টিউম এসব আলোচনা নিয়ে।’

আজিজুল হাকিমের সঙ্গে এবার যোগ দিলেন শাহ আলম দুলাল ও হারুনুর রশীদ। তাঁরা সবাই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। জানা গেল, এই বন্ধুতালিকায় আরও আছেন ফজলুর রহমান বাবু, তুষার খান, মান্নান হীরা, শান্তা ইসলাম, আলি মামুনসহ অনেকে।

 ‘ইবলিশ নাটকটি মঞ্চে আসে ১৯৮১ সালে। অল্প সময়ের মধ্যে দর্শকদের কাছে অনেক বেশি জনপ্রিয়তা পায়। দেশ-বিদেশের মঞ্চে প্রায় ৪০০ প্রদর্শনী হয়েছে। না খেয়ে, না ঘুমিয়ে শুধু প্রদর্শনী আর প্রদর্শনী করেছি। জীবনের অন্য এক আনন্দ উপভোগ করেছিলাম এই মঞ্চে। আজ এত বছর পরও যখন আবার মঞ্চে দাঁড়াচ্ছি, সেসব দিনের অনুভূতি তারিখ করে। ভালো লাগছে আরণ্যকের ৪৫ বছরের উৎসবে দর্শকদের সামনে আবার অভিনয় নিয়ে দাঁড়াব।’ বললেন হারুনুর রশীদ।

 শাহ আলম দুলাল যোগ করলেন, ‘আরণ্যক সক্রিয়ভাবে ৪৫টি বছর মঞ্চ সরব রেখেছে। এটি একটি ঘটনা। সেই ঘটনার সঙ্গে আমরা তো আছিই। আর এই উৎসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে সবাই আরণ্যকের এই দীর্ঘ পথযাত্রার ঘটনার সাক্ষী হবেন। এটা অনেক আনন্দের বিষয়। প্রিয় দর্শক, সাংবাদিক, শুভানুধ্যায়ী সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এই আনন্দ উপভোগ করতে চাই।’

একে একে সবাই অংশ নিলেন স্মৃতিচারণাপর্বে। ফাঁকে ফাঁকে চলল মহড়াও। তখনো যানজট ঠেলে মহড়ায় এসে পৌঁছাতে পারলেন বেশ কজন। এক ফাঁকে মুঠোফোনে কথা হলো ফজলুর রহমান বাবুর সঙ্গে। বললেন ‘গত কদিনের মহড়া করতে গিয়ে আমার ভেতরে একটা ঘটনা ঘটে গেছে। প্রতিদিন যতই মহড়ায় দাঁড়াচ্ছি, ততই অতীত যেন আমাকে তাড়িত করছে। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম এখন থেকে আবার নিয়মিত মঞ্চে কাজ করব। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে তা শুরু করলাম।’

এবার মহড়াকক্ষ থেকে বিদায় নেওয়ার পালা। বিদায় নিতেই মামুনুর রশীদ হাতে দিলেন উৎসবের একটি দাওয়াতপত্র এবং সঙ্গে উৎসবের সব নাটক প্রদর্শনীর তালিকা। আর সেই তালিকায় দেখা গেল আরণ্যকের তিনটি নাটক ছাড়াও হংকং, নরওয়ে, ইরানসহ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের পাঁচটি নাটক প্রদর্শিত হবে এখানে। এ কারণেই এবারের উৎসবের আরণ্যক নাম দিয়েছে ‘পুষ্প ও মঙ্গল আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব ২০১৭’।

পাঠকের মন্তব্য