No Name | Times News 24 | Fast Online News Portal | সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
নিজস্ব
প্রতিবেদক: শাকীরিন, ঢাকা
রাজধানীর আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিস দীর্ঘদিন ধরেই দালালচক্রের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের জন্য এক আতঙ্কের জায়গায় পরিণত হয়েছিল। পাসপোর্টের জন্য আসা সাধারণ নাগরিকদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি, কিংবা দ্রুত পাসপোর্ট সরবরাহের নামে প্রতারণার অভিযোগ ছিল বহুদিনের। অবশেষে সেই দীর্ঘদিনের অনিয়মের লাগাম টানতে মাঠে নেমেছে প্রশাসন। গত সপ্তাহে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে একাধিক দালালকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং পাসপোর্ট অফিসের ভেতর-বাহিরে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
সরকারি
সেবাখাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠান—আগারগাঁও
পাসপোর্ট অফিস প্রতিদিন গড়ে
তিন থেকে পাঁচ হাজার
নাগরিকের সেবা দিয়ে থাকে।
অথচ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল,
এখানে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যের কারণে প্রকৃত আবেদনকারীরা ভোগান্তিতে পড়েন।
অভিযোগ উঠেছিল—দালালরা অফিসের ভেতরে-বাইরে অবস্থান নিয়ে আগত নাগরিকদের বিভ্রান্ত করে নিজেদের ফাঁদে ফেলে। তারা দাবি করত, “অল্প সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট পেতে চাইলে তাদের মাধ্যমেই করতে হবে।”সাধারণ মানুষ অনেক সময় ঝামেলা এড়াতে তাদের কথায় রাজি হতো এবং অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য হতো।
অভিযানের
সূচনা ও প্রশাসনের অবস্থান
গত
বৃহস্পতিবার (৩ অক্টোবর) সকালে
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), র্যাব-২, এবং পাসপোর্ট
অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে আগারগাঁও
পাসপোর্ট অফিসে এক বিশেষ অভিযান
পরিচালিত হয়। অভিযান পরিচালনা
করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের
উত্তরা জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) মো. শফিকুল
ইসলাম, যিনি জানান“আমরা
নাগরিক সেবা সহজীকরণের অংশ
হিসেবে পাসপোর্ট অফিসকে দালালমুক্ত করতে কাজ করছি।
কোনোভাবেই সরকারি সেবার নামে কেউ যেন
সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতে না পারে,
সেটি নিশ্চিত করাই আমাদের মূল
লক্ষ্য।”
অভিযান চলাকালে অফিস চত্বরে ও আশপাশের এলাকায় সন্দেহজনকভাবে অবস্থান নেওয়া প্রায় ৪৫ জন ব্যক্তিকে আটক করা হয়। প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে ২৭ জনকে দালালচক্রের সক্রিয় সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাদের কাছ থেকে অসংখ্য নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্টের ফটোকপি, সরকারি ফর্ম, এবং মোবাইল ফোনে লেনদেনের তথ্য উদ্ধার করা হয়েছে।
সাধারণ
মানুষের প্রতিক্রিয়া
অভিযান চলাকালে পাসপোর্ট অফিসে সেবা নিতে আসা অনেকেই প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। মোহাম্মদ আল আমিন, মিরপুরের এক বাসিন্দা, বলেন“আমার ভাই কয়েক মাস আগে পাসপোর্ট করতে এসে দালালের ফাঁদে পড়েছিল। তারা ১০ হাজার টাকা নিয়ে বলেছিল, এক সপ্তাহে পাসপোর্ট হবে। শেষ পর্যন্ত তিন মাসেও কিছু হয়নি। আজকের অভিযান দেখে মনে হচ্ছে অবশেষে প্রশাসন সত্যিই কাজ শুরু করেছে।”
আরেকজন
নারী আবেদনকারী রোকেয়া বেগম বলেন“আগে
বাইরে পা রাখলেই পাঁচ-ছয়জন এসে ঘিরে
ফেলত, এখন সেটা কমেছে।
যদি এভাবে নিয়মিত অভিযান হয়, তাহলে আমরা
শান্তিতে কাজ করতে পারব।”
অভিযানের
পর থেকেই পাসপোর্ট অফিস এলাকায় সিসিটিভি
ক্যামেরার সংখ্যা দ্বিগুণ করা হয়েছে। প্রবেশপথে
পুলিশের স্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে, এবং
প্রতিদিন সকালে টহল টিম অফিস
চত্বরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাশাপাশি,
আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করতে
পাসপোর্ট অধিদপ্তর নতুন ডিজিটাল কিউ
ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করতে যাচ্ছে,
যাতে কেউ অফিসে এসে
ভুয়া গাইড বা সহায়তার
প্রলোভনে না পড়ে।
এছাড়া,
‘দালালমুক্ত সেবা সপ্তাহ’ নামে
একটি সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
সেখানে নাগরিকদের জানানো হচ্ছে কীভাবে নিজেরাই অনলাইনে আবেদন করে সরকারি ফি
প্রদান করে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি
শেষ করা যায়।
গ্রেফতারকৃতদের
বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০ (প্রতারণা), ৪৬৮
(জাল কাগজ তৈরি), এবং
১৭ ৮ ধারায় মামলা
দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের
পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে,
এদের অনেকের বিরুদ্ধেই আগে একাধিক মামলার
রেকর্ড রয়েছে। এদের মধ্যে
আসামিদের
তালিকা রয়েছে
১-মোহাম্মদ লোকমান হোসেন বয়স ২৬
২-মোহাম্মদ সালেদ শেখ বয়স ৩৩
৩-সজল বয়স ২৬
৪-সজীব বয়স ২৮
৫-স্বপন বয়স ২৪
৬-মোহাম্মদ আলালউদ্দিন বয়স ৩৫
“আমরা
এখন শুধু আগারগাঁও নয়,
দেশের প্রতিটি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসেও এ ধরনের অভিযান
চালানোর পরিকল্পনা নিয়েছি। দালালচক্র যেখানেই থাকুক, আইনের আওতায় আনা হবে।”
অভিযান
শেষে পাসপোর্ট অধিদপ্তর এক বিজ্ঞপ্তি জারি
করে জানিয়েছে“কোনো দালালের মাধ্যমে
নয়, কেবল নিজ দায়িত্বে
অনলাইন আবেদন ও সরকারি ফি
জমা দিয়ে পাসপোর্টের আবেদন
করা নিরাপদ ও বৈধ উপায়।
কেউ যদি কোনো প্রকার
আর্থিক লেনদেন বা প্রতারণার চেষ্টা
করে, সাথে সাথে নিকটস্থ
পুলিশ সদস্যকে জানাতে হবে।”