MD ANIS | Times News 24 | Fast Online News Portal | বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
জীবন ও মৃত্যু মানবজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত দুটি অমোঘ বাস্তবতা। এর মধ্যে একটি পার্থিব দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী অধ্যায়, আর অপরটি পরলৌকিক ও চিরন্তন জীবনের প্রবেশদ্বার। মহান আল্লাহ তাআলা এই জীবন ও মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন মূলত কে কত উত্তম আমল করতে পারে, তা পরীক্ষা করার জন্য। পবিত্র কোরআনের সূরা আল-মুলকের ২ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, "যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন যে, তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে কে সর্বাধিক উত্তম। আর তিনি মহাপরাক্রমশালী ও অতিশয় ক্ষমাশীল।"
মানুষ সাধারণত বেঁচে থাকা অবস্থায় যেসব আমল করে, আখেরাতে আল্লাহ তাআলা কেবল সেগুলোরই প্রতিদান দেন। তবে নিয়ত সঠিক ও শুদ্ধ থাকলে শরিয়তের এমন কিছু বিশেষ কল্যাণকর আমল রয়েছে, যা মৃত্যুর পরও মানুষের আমলনামায় অনবরত সওয়াব যুক্ত করতে থাকে। ইসলামের পরিভাষায় একে ‘সদকায়ে জারিয়া’ বা প্রবাহমান দান বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিভিন্ন বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকে মৃত্যুর পরও সওয়াব জারী থাকার এমন গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. দ্বীনি ও কল্যাণকর ইলম শিক্ষা দেওয়া: রাসুল (সা.) বলেন, "যে মানুষকে ইলম শিক্ষা দিল, এ ইলম অনুযায়ী আমলকারীর সমপরিমাণ সওয়াব তার আমলনামায়ও যুক্ত হতে থাকবে। অথচ তাদের কারো সওয়াবে কোনো কমতি হবে না।" (ইবনু মাজাহ: ২৪Check) এর মধ্যে উপকারী বইপত্র বা কিতাব রচনা করাও অন্তর্ভুক্ত, যার মাধ্যমে মানুষ সঠিক পথের দিশা পায়।
২. নেক বা সৎ সন্তান রেখে যাওয়া: এমন যোগ্য ও সৎ সন্তান দুনিয়াতে রেখে যাওয়া, যে মা-বাবার মৃত্যুর পর তাদের মাগফিরাত ও ক্ষমার জন্য আল্লাহর দরবারে নিয়মিত দোয়া করবে। হাদিস অনুযায়ী, মানুষের মৃত্যুর পর যে কয়েকটি আমলের সওয়াব অব্যাহত থাকে, তার মধ্যে নেক সন্তানের দোয়া অন্যতম।
৩. মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ: সমাজে আল্লাহর ইবাদতের জন্য মসজিদ তৈরি করা একটি অন্যতম সদকায়ে জারিয়া। কারণ মসজিদে নামাজ আদায়ের পাশাপাশি কুরআন শিক্ষা ও কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। রাসুল (সা.) বলেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য মসজিদ তৈরি করল, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে ঘর তৈরি করবেন।" (মুসলিম: ১২১৮)
৪. পবিত্র কোরআন ও ধর্মীয় কিতাব বিতরণ: কোনো ব্যক্তি যদি মসজিদ, মাদরাসা, লাইব্রেরি বা কোনো প্রতিষ্ঠানে পবিত্র কোরআন কিংবা উপকারী দ্বীনি কিতাব বিতরণ করে বা নিজের দায়িত্বে রেখে যায়, তবে যতদিন মানুষ তা পড়বে, তার সওয়াবের একটি অংশ কবরে থাকা সেই ব্যক্তিও পেতে থাকবে।
৫. বৃক্ষরোপণ বা গাছ লাগানো: পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও মানবকল্যাণে গাছ লাগানো ইসলামের অন্যতম সওয়াবের কাজ। সহিহ মুসলিমের (হাদিস নং: ৪০৫০) বর্ণনা অনুযায়ী, কোনো মুসলিম যদি গাছ রোপণ করে এবং তা থেকে কোনো মানুষ বা পাখি ফল খায়, এমনকি কেউ যদি তা চুরি করে বা কেটেও ফেলে, তবে সেটিও ওই ব্যক্তির জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।
৬. অভাবগ্রস্তদের জন্য ঘর-বাড়ি তৈরি ও পানির ব্যবস্থা: অসহায় মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেওয়া কিংবা তৃষ্ণার্ত মানুষের জন্য খাওয়ার পানির ব্যবস্থা (যেমন: কূপ খনন, নলকূপ স্থাপন বা পানির ঝর্ণা তৈরি) করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। বুখারির হাদিস অনুযায়ী, প্রতিটি সজীব বা তৃষ্ণার্ত অন্তরকে পানি পান করানোর জন্য মহান আল্লাহর দরবারে বিশেষ সওয়াব ও ক্ষমার ঘোষণা রয়েছে।
৭. আল্লাহর দিকে দাওয়াত ও সীমান্ত রক্ষা: মানুষকে হেদায়েত ও আলোর পথে আহ্বান করা এবং দেশের বা ইসলামের সীমান্ত পাহারা দেওয়া এমন দুটি আমল, যা মৃত্যুর পরও কিয়ামত পর্যন্ত আমলনামায় সওয়াব বাড়িয়ে দেয় এবং কবরের ফিতনা ও পরীক্ষা থেকে নিরাপদ রাখে।
সহিহ মুসলিমের ৪৩১০ নম্বর হাদিসে রাসুল (সা.) বিষয়টি এক বাক্যে স্পষ্ট করে বলেছেন, "মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার যাবতীয় আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে ৩ টি আমল বন্ধ হয় না— ১. সদকায়ে জারিয়া, ২. এমন ইলম যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং ৩. এমন নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।" মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সবসময় উত্তম আমল ও মানবতার কল্যাণে কাজ করার তাওফিক দান করুন।