লাভলু সরকার | Times News 24 | Fast Online News Portal | বুধবার, ২০ মে, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
প্রবন্ধ: লেখক : লাভলু সরকার
ভূমিকা- শাস্তি মানব সভ্যতার আদিমতম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির একটি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সমাজে শাস্তির প্রয়োজনীয়তা বহু পুরনো। তবে শাস্তির প্রকৃতি ও মাত্রা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত ও চর্চিত হলো মৃত্যুদণ্ড বা ফাঁসি। প্রশ্ন উঠে— একজন অপরাধীকে ফাঁসি দিলে সে তো আর শেখার সুযোগ পায় না, তবে কাদের শেখানো হয়? সমাজকে কী বার্তা দেওয়া হয়?
এই প্রবন্ধে আমরা খুঁজে দেখবো ফাঁসির নৈতিক ভিত্তি, এর মাধ্যমে সমাজ কী শিক্ষা পায়, এই শাস্তির পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি, এবং বিকল্প পথ কী হতে পারে।
১. ফাঁসি: সংজ্ঞা ও প্রেক্ষাপট
ফাঁসি
বা মৃত্যুদণ্ড হলো এমন এক
শাস্তি যা অপরাধীকে প্রাণদণ্ড
দিয়ে প্রদান করা হয়। সাধারণত
হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, রাষ্ট্রদ্রোহ, সন্ত্রাসবাদ ইত্যাদি গুরুতর অপরাধে এটি দেওয়া হয়।
আইনি
স্বীকৃতি:
অনেক
দেশে এখনো মৃত্যুদণ্ড বৈধ,
আবার কিছু দেশে এটি
নিষিদ্ধ। যেমন:
প্রশ্ন: একজন অপরাধীকে ফাঁসি দিয়ে যখন শেষ করে দেওয়া হয়, তখন সে তো আর সংশোধিত হওয়ার সুযোগ পায় না। তাহলে কাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য এই চূড়ান্ত শাস্তি?
২. শাস্তির নৈতিক ভিত্তি: প্রধান দর্শনগুলো
ক. প্রতিশোধবাদ (Retributivism):
এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, অপরাধীর প্রতি শাস্তি তার অপরাধের ন্যায্য প্রতিক্রিয়া। অর্থাৎ, যেহেতু অপরাধী একাধিক প্রাণ নষ্ট করেছে বা ভয়াবহ অপরাধ করেছে, তাই তার জীবন নেওয়াও ন্যায্য। “An eye for an eye, a tooth for a tooth.”
সমালোচনা: এতে শাস্তি শুধুমাত্র প্রতিশোধ হয়ে দাঁড়ায়; নৈতিক উন্নয়ন বা সংশোধনের জায়গা থাকে না।
খ. প্রতিরোধবাদ (Deterrence
Theory):
সমালোচনা: অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, মৃত্যুদণ্ড অপরাধ প্রতিরোধে খুব বেশি কার্যকর নয়।
গ. সংশোধনবাদ (Rehabilitation
Theory):
এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, শাস্তির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অপরাধীকে
সংশোধন করা, সমাজে ফিরিয়ে
আনা। কিন্তু ফাঁসি এই উদ্দেশ্যকে একদম
শেষ করে দেয়।
ঘ. সমাজরক্ষা তত্ত্ব (Incapacitation
Theory):
এই মতবাদ অনুসারে, কিছু অপরাধী এতটাই বিপজ্জনক হয় যে তাদের সমাজ থেকে চিরতরে সরিয়ে ফেলতে হয়। ফাঁসি সেই চূড়ান্ত উপায়।
৩. ফাঁসির মাধ্যমে কাদের শেখানো হয়?
ক. ভবিষ্যৎ অপরাধীদের
যারা
অপরাধ করতে পারে, তাদের
উদ্দেশ্যে বার্তা:
"আইনের
হাত থেকে কেউ রেহাই
পায় না। এই অপরাধ
করলে মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছে।"
তবে
প্রশ্ন উঠে সব অপরাধী
কি ভেবে চিন্তে অপরাধ
করে? নাকি ক্ষণিকের রাগ,
মানসিক অসুস্থতা, বা চরম দারিদ্র্য
তার কারণ?
খ. সমাজের সাধারণ মানুষ
ফাঁসির
মাধ্যমে সমাজে একটি বার্তা দেওয়া
হয় যে
"ন্যায়বিচার
হয়েছে। অপরাধী তার প্রাপ্য শাস্তি
পেয়েছে।"
এই বার্তা অনেক সময় জনমনে
স্বস্তি আনে, বিশেষ করে
ভয়াবহ অপরাধের ক্ষেত্রে।
গ. ভুক্তভোগী পরিবার
ফাঁসি
অনেক সময় ভুক্তভোগীর পরিবারকে
এক ধরনের মানসিক বিচার দেয়—
“আমাদের
ক্ষতি হয়েছে, অপরাধীও তার মূল্য চুকিয়েছে।”
কিন্তু
সব পরিবার কি সত্যিই শান্তি
পায়? অনেকেই বলেন
“আমরা ক্ষতি পুষিয়ে পাইনি, বরং একজন মানুষ মারা গেছে।”
৪. সমাজকে কী বার্তা দেওয়া
হয়?
ফাঁসির
মাধ্যমে রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
প্রতিষ্ঠান কিছু বার্তা দেয়:
১. অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কঠোর
রাষ্ট্র
এই বার্তা দেয় যে, সমাজে
অপরাধ সহ্য করা হবে
না। এটি একপ্রকার মনস্তাত্ত্বিক
নিয়ন্ত্রণ কৌশল।
২. আইন সবার জন্য
সমান
যদি
প্রভাবশালী কেউ ফাঁসি পায়,
তখন বার্তা হয়
“আইনের
চোখে সবাই সমান।”
৩. বিচারের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আছে
ফাঁসি
প্রদানের আগে দীর্ঘ বিচারিক
প্রক্রিয়া চলায়, এটি জনগণের মধ্যে
আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি
আস্থা জাগায়।
৪. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়েছে
গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে ফাঁসি যেন ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হয়ে দাঁড়ায়।
৫. ফাঁসির নৈতিকতা নিয়ে বিতর্ক
পক্ষে
যুক্তি:
বিপক্ষে
যুক্তি:
৬. মৃত্যুদণ্ডের বিকল্প কী হতে পারে?
১. যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
ফাঁসির
পরিবর্তে অপরাধীকে আমৃত্যু বন্দী রেখে সামাজিক সুরক্ষা
নিশ্চিত করা যায়।
২. সংশোধনাগার ভিত্তিক ব্যবস্থা
অপরাধীকে
মনোচিকিৎসা, শিক্ষা ও শ্রমের মাধ্যমে
সমাজে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ।
৩.
restorative justice (পুনঃসংহতিমূলক
বিচার)
এই ব্যবস্থায় অপরাধী, ভুক্তভোগী ও সমাজ একত্রে বসে সমস্যার সমাধান করে— বিচার হয়, তবে সহানুভূতির মাধ্যমে।
৭. ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মৃত্যুদণ্ড
ইসলাম:
কিছু
নির্দিষ্ট অপরাধে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদিত, তবে “তাওবা” বা
ক্ষমা লাভের সুযোগও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নিহত
ব্যক্তির পরিবার ক্ষমা করে দিলে মৃত্যুদণ্ড
বাতিল হয়।
খ্রিষ্টধর্ম:
খ্রিষ্টধর্মে
ক্ষমার ওপর জোর দেওয়া
হয়। অনেক খ্রিষ্টান ধর্মতাত্ত্বিক
মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেন।
হিন্দুধর্ম
ও বৌদ্ধধর্ম:
এই ধর্মগুলো প্রাণহানির বিরুদ্ধে। “অহিংসা পরম ধর্ম” নীতিতে প্রাণনাশ নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
৮. বাস্তব উদাহরণ: কিছু আলোচিত মৃত্যু
পরবর্তী শিক্ষা
ক. নরেন্দ্র দত্ত ওরফে ধর্ষণ
মামলার ফাঁসি (ভারত)
এই ফাঁসির মাধ্যমে ভারতে একপ্রকার বার্তা দেওয়া হয় নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র প্রস্তুত।
ফাঁসি
একটি চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় শাস্তি,
যার নৈতিক ভিত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে
বিতর্ক চলে আসছে। এটি
একদিকে যেমন অপরাধের বিরুদ্ধে
কঠোর বার্তা দেয়, তেমনি অপরাধীর
সংশোধনের সুযোগও চিরতরে নষ্ট করে দেয়।
সমাজে ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায়
এটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলেও, মানবাধিকার, বিচার বিভ্রাট ও সহানুভূতির অভাবের
কারণে এর নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ।
ফাঁসির বদলে ন্যায়, মানবতা
ও পুনঃসংহতির সমন্বিত পথ খোঁজা উচিত,
যাতে অপরাধ দমন হয় এবং
মানবিক মূল্যবোধও বজায় থাকে।
ছবি : সংগৃহীত