MD ANIS | Times News 24 | Fast Online News Portal | সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
চারদিকে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের ক্ষত, ধূলিসাৎ হওয়া বহুতল ভবন আর স্বজন হারানোর সীমাহীন হাহাকার। এই চরম ও নির্মম বাস্তবতার মাঝেই ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার একটি স্থানীয় বাজারে সবার স্থির দৃষ্টি আটকে আছে সচল থাকা একটি উজ্জ্বল পর্দার দিকে। পর্দায় চলছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের একটি বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচ। নিউজিল্যান্ড ও মিশরের মধ্যকার সেই হাইভোল্টেজ ম্যাচটি দেখতে ধ্বংসস্তূপের মাঝেই ভিড় জমিয়েছেন শত শত যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনি ফুটবলপ্রেমী। গাজার মানুষের কাছে মিশরের অধিনায়ক ও বিশ্বখ্যাত স্ট্রাইকার মোহাম্মদ সালাহ এক জীবন্ত কিংবদন্তি। আর প্রিয় তারকার ম্যাচটিতে নিউজিল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সালাহরা জয় পেতেই গাজায় বইছে সাময়িক আনন্দের হাওয়া।
মিশরের হয়ে এই জয়ে এক গোল এবং চমৎকার একটি অ্যাসিস্ট করেছেন সালাহ। বাকি দুই গোল করেছেন মোস্তফা জিকো ও ট্রেজেগুয়েত। এর আগে ফিন সারম্যানের গোলে নিউজিল্যান্ড প্রথমার্ধে লিড নিলেও তা ধরে রাখতে পারেনি। প্রিয় দলের বিজয়ের পর গাজার ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে উৎসবের যেন কমতি নেই; অনেকেই বন্ধুর কাঁধে চড়ে মিশরের পতাকা উড়িয়ে উল্লাস করছেন। গাজার মধ্যাঞ্চলের জনবহুল নুসেইরাত এলাকার এই ধ্বংসস্তূপের মাঝে মানুষের মুখে ক্ষণিকের হাসি ফুটলেও, তাদের চারপাশের প্রতিদিনের বাস্তবতা বড়ই কঠিন। দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েল-হামাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আজ গাজাকে এক বিশাল মানববর্জিত ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।
ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (PFA) অন্যতম সদস্য মোস্তফা সিয়াম বলেন, "গাজাবাসীর জন্য বিশ্বকাপ কেবল একটি সাধারণ খেলা বা বিনোদন নয়। ফুটবল ম্যাচের এই ৯০ মিনিটের চরম উত্তেজনা তাদের চারপাশের সীমাহীন যন্ত্রণা, মৃত্যুভয় আর তীব্র মানসিক উদ্বেগ থেকে ক্ষণিকের জন্য হলেও এক পশলা সাময়িক মুক্তি দেয়।"
মধ্য গাজার আল-জাওয়াইদার একটি বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে গিয়ে দেখা যায় আরও মর্মস্পর্শী দৃশ্য। প্লাস্টিকের ত্রিপলের তৈরি তাঁবুর নিচে ছোট একটি জেনারেটর-চালিত টেলিভিশন ঘিরে ধুলাবালির মেঝে আর ভাঙা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে মানুষ উপভোগ করছেন বিশ্বকাপের ম্যাচ। সেখানে খেলা দেখতে আসা ঈদ আল-আত্তার আক্ষেপ করে বলেন, "আমরা সাধ্যমতো বিশ্বকাপের স্বাদ নেওয়ার চেষ্টা করছি। স্টেডিয়ামে গিয়ে সরাসরি প্রিয় দলের ম্যাচ দেখা আমাদের জন্য আজীবন এক অধরা স্বপ্ন, কারণ আমরা চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ। ইসরায়েলের কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকা এই অবরুদ্ধ ভূখণ্ড থেকে মারাত্মক কোনো অসুস্থতায় বিশেষ চিকিৎসা ছাড়া বাইরে যাওয়ার কোনো আইনি উপায় নেই।"
গাজা সিটির ২৭ বছর বয়সী যুবক মাজেন আল-গুল বিশ্বকাপের বর্ণিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, "গোটা বিশ্ব যখন ফুটবলের আনন্দে মেতে উঠেছে, তখন আমাদের নিজের কোনো মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, বিদ্যুৎ নেই, চিকিৎসার সুযোগ নেই, স্কুল নেই। বিশ্বের এই নির্মম বৈষম্য আমাদের ভেতর এক তীব্র ক্ষোভ ও চরম হতাশা তৈরি করে।" অনেকেই ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সোনালী স্মৃতিচারণ করেন, যখন গাজা সিটির বড় বড় স্টেডিয়াম আর ঝলমলে রেস্তোরাঁয় হাজার হাজার মানুষ একসাথে খেলা উপভোগ করতেন। আজ সেই স্টেডিয়াম বা রেস্তোরাঁর কোনো অস্তিত্ব নেই; সবই ইসরায়েলি বিমান হামলায় মাটির সাথে মিশে গেছে।
ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে বিশ্ব মিডিয়ার মূল আলোচনার একদম বাইরে, দক্ষিণ গাজার প্রধান শহর খান ইউনিসের বিস্তীর্ণ সমুদ্র সৈকতে চলছে ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব অন্য এক বিশ্বকাপ। সেখানে তপ্ত বালির ওপর বুট ছাড়া সম্পূর্ণ খালি পায়ে ফুটবল খেলছে একদল যুদ্ধাহত ও বাস্তুচ্যুত তরুণ।
তাদের স্থানীয় ফুটবল কোচ মোহাম্মদ আবু তাহ আবেগঘন কণ্ঠে জানালেন, "এই প্রতিকূলতায় ফুটবলই আমাদের মানসিকভাবে বেঁচে থাকার একমাত্র প্রধান চালিকাশক্তি ও মুক্তি।" তাঁর সহকর্মী জাবের আল-বাশিটি যোগ করেন, "আমাদের এই ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে ধ্বংসপ্রাপ্ত এক রক্তাক্ত মাটিতে। যেখানে কোনো আধুনিক গ্যালারি নেই, নেই কোনো উন্নত সরঞ্জাম। কিন্তু ভাঙা কনক্রিটের ব্লকে বসে খেলা দেখা দর্শকদের ফুটবল ও জীবনের প্রতি ভালোবাসার বিন্দুমাত্র কোনো অভাব নেই।" গাজার এই সাহসী তরুণরা ফুটবলকে অস্ত্র বানিয়ে যেন বিশ্বকে জানান দিচ্ছে—সব হারিয়েও তারা এখনও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে।