MD ANIS | Times News 24 | Fast Online News Portal | সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
ফুটবল মাঠে বিশ্বসেরা মহাতারকাদের পায়ের জাদুকরী লড়াইয়ের আড়ালে কখনো কখনো এমন কিছু অন্ধকার অধ্যায়ের জন্ম হয়, যা খেলার চেতনাকেই চিরতরে কালিমালিপ্ত করে দেয়। বিশ্বফুটবলের সুদীর্ঘ ইতিহাসে তেমনই এক নিকৃষ্ট, বিতর্কিত ও কুখ্যাত অধ্যায়ের নাম ‘দ্য হোলি ওয়াটার’ (পবিত্র জল) কেলেঙ্কারি। ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে দুই লাতিন পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার চিরন্তন দ্বৈরথকে এই ঘটনা আজীবনের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ ও কলঙ্কিত করে দিয়েছিল।
সেবার ইতালির তুরিন শহরে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর নকআউট ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ব্রাজিলের একের পর এক আক্রমণভাগের ধারালো শটে দিশেহারা আর্জেন্টিনা যখন নিজেদের রক্ষণভাগ সামলাতে ব্যস্ত, তখনই মাঠের ভেতর ঘটে সেই অবিশ্বাস্য ও অনৈতিক ঘটনা। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে এক খেলোয়াড়ের ইনজুরির কারণে খেলা সাময়িক বন্ধ থাকার সুযোগে, মাঠের ভেতরেই আর্জেন্টাইন ফিজিওর কাছ থেকে একটি বোতল চেয়ে নিয়ে পানি পান করেন ব্রাজিলের তারকা লেফটব্যাক ব্র্যাঙ্কো। আর সেই পানির বোতলে চুমুক দেওয়ার পর থেকেই যেন শুরু হয় ফুটবল ইতিহাসের এক রহস্যময় ট্র্যাজেডি।
ম্যারাডোনার জয় এবং ১৫ বছর পর চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি: পানি পানের ঠিক পরপরই মাঠে এর আগে অপ্রতিরোধ্য আর চরম চনমনে গতিতে খেলতে থাকা ব্র্যাঙ্কো হুট করেই কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়েন। তিনি মাঠের ভেতর মাথা ঘোরা ও নিজের শারীরিক স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলার অভিযোগ করতে থাকেন। আর প্রতিপক্ষের এই ঝিমিয়ে পড়ার সুবর্ণ সুযোগেই ব্রাজিলের রক্ষণদুর্গ ভেঙে ক্লদিও ক্যানিজিয়াকে দিয়ে ম্যাচের জয়সূচক একমাত্র গোলটি করিয়ে নেন আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বর দিয়েগো ম্যারাডোনা। ১-০ গোলের এই জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে চলে যায় আর্জেন্টিনা।
ম্যাচ শেষে ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার ব্র্যাঙ্কো আর্জেন্টিনার সরবরাহ করা ওই বোতলজাত পানিতে চেতনানাশক বা ক্ষতিকর ওষুধ মেশানোর গুরুতর অভিযোগ আনেন। যদিও তৎকালীন আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও সে দেশের মিডিয়া বিষয়টিকে তীব্র উপহাস ও ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ঘটনার দীর্ঘ ১৫ বছর পর, ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার একটি জনপ্রিয় টিভি টকশোতে ডিয়েগো ম্যারাডোনা নিজেই হাসতে হাসতে স্বীকার করেন সেই অভিযোগের নির্মম সত্যতা! তিনি অকপটে জানান, সেদিন ব্র্যাঙ্কোর পান করা আর্জেন্টিনার ওই বিশেষ বোতলের পানিতে সত্যিই শক্তিশালী ‘ট্র্যাঙ্কুলাইজার’ বা ঘুমের ওষুধ মেশানো ছিল।
ম্যারাডোনার এই বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি সে সময় বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করলেও ফুটবলীয় কূটনীতি ও রাজনীতির মারপ্যাঁচে অপরাধী বা আর্জেন্টিনার সেই মেডিকেল স্টাফরা শেষ পর্যন্ত অধরাই থেকে যায়। তবে ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃতি হয়তো নিজের হাতেই এই অন্যায়ের বিচার তুলে নিয়েছিল। যার নিখুঁত প্রমাণ মেলে সেই ১৯৯০ বিশ্বকাপেরই ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে ডিয়েগো ম্যারাডোনার মাঠের ভেতরের অশ্রুসিক্ত কান্না এবং পরবর্তী ১৯৯৪ বিশ্বকাপে নিষিদ্ধ ড্রাগ বা এফিড্রিন টেস্টে পজিটিভ হয়ে ফুটবল থেকে তাঁর বহিষ্কার হওয়ার ট্র্যাজেডিতে।
সেই অনৈতিক ম্যাচ হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও, শক্তিমত্তার জোরে পরবর্তী টানা তিন বিশ্বকাপের (১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২) ফাইনালে খেলেছিল সেলেসাওরা (ব্রাজিল)। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার প্রাণপুরুষ ম্যারাডোনাকে ক্যারিয়ারের বাকিটা সময় ধুঁকতে হয়েছিল তীব্র মাদকের মরণফাঁদে। অনৈতিক উপায়ে পানির বোতল নিয়ে ছলচাতুরী করেও সেবার বিশ্বকাপের শিরোপা জিততে পারেনি আর্জেন্টিনা, কিন্তু এই ‘হোলি ওয়াটার’ স্ক্যান্ডাল ফুটবলের জগতে আজীবন এক কলঙ্কময় ও লজ্জার ইতিহাস হয়ে থেকে যাবে।