MD ANIS | Times News 24 | Fast Online News Portal | সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
ফিফা বিশ্বকাপের ম্যাচ শেষে স্টেডিয়ামের গ্যালারির আবর্জনা নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করে বরাবরের মতোই বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন জাপানি ফুটবল সমর্থকরা। তবে বৈশ্বিক মঞ্চে কুড়ানো তাদের এই ঐতিহ্যবাহী পরিচ্ছন্নতার অভ্যাসটি এবার খোদ নিজেদের দেশেই তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের মুখে পড়েছে। চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ‘ব্লু সামুরাই’দের (জাপান দল) প্রথম ম্যাচ শেষে গ্যালারিতে জাপানি পুরুষদের ময়লা পরিষ্কার করার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরই এই নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়।
নেটিজেনদের একাংশ জাপানি পুরুষদের এই প্রশংসনীয় অভ্যাসের ভেতরের এক চরম ও নির্মম বৈপরীত্য বা ভণ্ডামি সমাজমাধ্যমের পাতায় তুলে ধরেছেন। তাদের দাবি—যে পুরুষরা বিদেশের মাটিতে ক্যামেরার সামনে জনসমক্ষে নিজেদের ময়লা কুড়াচ্ছেন, তারাই নিজ ঘরে সমস্ত অলিখিত কাজের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছেন পরিবারের নারীদের ওপর। সম্প্রতি জাপানের নেটদুনিয়ায় একটি পোস্ট ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়, যেখানে পাশাপাশি দুটি ছবি জোড়া দেওয়া হয়েছিল। একপাশে দেখা যায়, এক ব্যক্তি স্টেডিয়ামের আবর্জনা পরিষ্কার করছেন; আর অন্যপাশের ছবিতে দেখা যায়, সেই একই ব্যক্তি ঘরে কাপড় ধোয়ার ঝুড়ির পাশে সোফায় অলসভাবে শুয়ে মোবাইল টিপছেন, আর তাঁর স্ত্রী রান্নাঘরে এক গাদা বাসন মাজছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) লাখ লাখ ভিউ পাওয়া এই পোস্টে দাবি করা হয়, গৃহস্থালি কাজে জাপানি পুরুষদের সময় দেওয়ার হার উন্নত বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন।
তথ্যে উঠে এলো লিঙ্গ বৈষম্যের ভয়ংকর চিত্র: জনসমক্ষে নিজের আবর্জনা নিজে পরিষ্কার করার বিষয়টি জাপানি সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত হলেও, ঘরের কাজের ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে জাপানি পুরুষদের অবস্থান সবার নিচে। আর্থিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (OECD) সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, জাপানি নারীরা প্রতিদিন গড়ে ৩ ঘণ্টারও বেশি সময় অবৈতনিক (গৃহস্থালি) কাজে ব্যয় করেন, যা পুরুষদের তুলনায় ৫ গুণেরও বেশি। অন্যদিকে, পুরুষরা ঘরের কাজে দিনে মাত্র ৪৭ মিনিট সময় দেন। তরুণ কর্মজীবী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই বৈষম্য আরও প্রকট। ৬ বছরের কম বয়সী সন্তান রয়েছে—এমন জাপানি কর্মজীবী মায়েরা প্রতিদিন গৃহস্থালি ও বাচ্চার দেখভালে ৭ ঘণ্টারও বেশি সময় দেন, যেখানে বাবারা দেন ২ ঘণ্টারও কম। জাপানের এই লিঙ্গ বৈষম্যের হার যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বহুগুণ বেশি।
কোচ মোরিয়াসুর ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও ড্রেসিংরুমের চিত্র: বিশ্বকাপে নিজেদের জায়গা পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে জাপানি সমর্থকরা বিশ্বজুড়ে যে অনন্য সুনাম তৈরি করেছেন, তা নিয়ে জাপানের ডাগআউট ও ফুটবলাররা বেশ গর্বিত। ড্যাপাস কাউবয় স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুম ম্যাচ শেষে একদম নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করে রেখে ফিফারও ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছে জাপান দল। তবে মেক্সিকোতে তিউনিসিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচের প্রাক্কালে এক সংবাদ সম্মেলনে জাপানের প্রধান কোচ হাজিমে মোরিয়াসু এই পরিচ্ছন্নতা অভিযানের একটি নেতিবাচক বা ভিন্ন পিঠের কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন।
কোচ মোরিয়াসু বলেন, "আমি ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়, কোচ এবং বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে মিশেছি। তারা এই অভ্যাসের একটি ভিন্ন ও মানবিক দিক তুলে ধরেছেন। তারা বলেছেন যে, বিদেশি সমর্থকরা যদি স্টেডিয়ামের সব ময়লা নিজেরাই কুড়িয়ে পরিষ্কার করে ফেলেন, তবে ওই স্টেডিয়ামে যারা স্থায়ী ‘পরিচ্ছন্নতা কর্মী’ বা সুইপার হিসেবে চাকরি করেন, তাদের রুটি-রুজি বা চাকরি কি ঝুঁকির মধ্যে পড়বে না? তাই আমি মনে করি, বিষয়টি শুধু অন্ধ প্রশংসা নয়, বরং দেখার পেছনে এমন একটি অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও রয়েছে।" এদিকে ঘরের কাজ না করা স্বামীদের নিয়ে ভুক্তভোগী জাপানি নারীদের একজন রসাত্মক সুরে লিখেছেন, ‘আমাদের ঘরের কাজ ফাঁকি দেওয়া স্বামীদের ঘরের ভেতরেও সবসময় সামুরাইদের নীল জার্সি পরিয়ে রাখা উচিত, যাতে অন্তত পরিচ্ছন্নতার ভূত মাথায় চাপে!’