MD ANIS | Times News 24 | Fast Online News Portal | সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনে অন্ধ সমর্থন দিয়ে যেকোনো মুহূর্তে আমেরিকার সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সব সময়ই দুই দেশের দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্রতার জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সেই ঐতিহাসিক সম্পর্কে চির ধরাতে শুরু করেছে এবং দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা এখন চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর, নগ্ন ও স্পষ্ট ভাষায় যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তা কূটনীতির ইতিহাসে অনেকের কাছে সরাসরি হুমকির মতো শুনিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত কয়েক দিন ধরে নেপথ্যে যে সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছিল, এটি মূলত তারই এক চূড়ান্ত ও প্রকাশ্য রূপ।
মার্কিন প্রভাবশালী গণমাধ্যম সিএনএনের (CNN) এক বিশেষ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্টতই তীব্র আশঙ্কা করছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের একাধিপত্য ধরে রাখতে ইসরায়েল হয়তো ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক শান্তি সমঝোতাটি যেকোনো উপায়ে ভেস্তে দিতে পারে। যদিও গত শুক্রবার ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ সাময়িক যুদ্ধবিরতি নবায়নে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মত হয়েছিল, তবে লেবাননে তেল আবিবের বিমান ও স্থল হামলা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ফলে দুই দেশের কূটনৈতিক লক্ষ্য ও দর্শনের মধ্যকার এই দূরত্ব তৈরি হওয়া যেন এখন সময়ের ব্যবধানে অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রানিং মেট এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সাম্প্রতিক মন্তব্য ছিল বিশ্ব রাজনীতির জন্য সবচেয়ে চমকপ্রদ ও নজিরবিহীন। বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের জনপ্রিয়তা ও ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হওয়ার কথা উল্লেখ করে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অত্যন্ত রূঢ়ভাবে বলেন, "এই মুহূর্তে গোটা পৃথিবীতে ডোনাল্ড ট্রাম্পই একমাত্র শক্তিশালী রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি ইসরায়েলের প্রতি এখনও কিছুটা সহানুভূতিশীল। আমি যদি আজ ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার কোনো নীতিনির্ধারক হতাম, তবে বিশ্বের বুকে অবশিষ্ট থাকা নিজেদের একমাত্র মহাশক্তিশালী পরম মিত্রকে এভাবে কথায় কথায় আক্রমণ বা বিরক্ত করতাম না।"
ভ্যান্স বারবার ইসরায়েলি প্রশাসনকে মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে সাবধানে পা ফেলার পরামর্শ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক অস্ত্রের ওপর ইসরায়েলের সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতার কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "ইসরায়েলি নেতাদের এবার বাস্তব পরিস্থিতি ও নিজেদের সামর্থ্য বোঝা উচিত। আপনারা মাত্র ৯০ লাখ মানুষের একটি ছোট দেশ। শুধু নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ এবং বোমাবর্ষণ চালিয়ে আপনারা আপনাদের প্রতিটি জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যার স্থায়ী সমাধান কখনোই করতে পারবেন না।"
জেডি ভ্যান্সের এই আক্রমণাত্মক সুর মূলত খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরই ক্ষোভের প্রতিধ্বনি। ট্রাম্পও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকবার ইসরায়েলের অতি-আক্রমণাত্মক সামরিক আচরণকে ‘অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সরাসরি সতর্ক করে হুংকার দিয়ে বলেছেন, "বিবি (নেতানিয়াহু), তোমাকে এবার সতর্ক ও সংযত হতে হবে; অন্যথায় খুব শিগগিরই তুমি গোটা বৈশ্বিক মানচিত্রে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়বে।"
এমনকি ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ (G7) শীর্ষ সম্মেলনেও ইসরায়েলকে উদ্দেশ করে ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "কাউকে বা কোনো একজন যোদ্ধাকে খোঁজার জন্য প্রতিবার একটি পুরো বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ ওই ভবনে আরও শত শত সাধারণ মানুষ ও শিশু থাকে এবং তারা সবাই হিজবুল্লাহ বা সন্ত্রাসী নয়।" তিনি আরও কড়া ভাষায় মনে করিয়ে দেন, "যুক্তরাষ্ট্রের ঢাল ও অর্থ না থাকলে আজ ইসরায়েলের কোনো অস্তিত্ব থাকত না। ইসরায়েল পৃথিবীর মানচিত্র থেকে শতভাগ মুছে যেত এবং ইসরায়েলের প্রতিটি বুদ্ধিমান মানুষ এই রূঢ় সত্যটি খুব ভালো করেই জানে।"
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কঠোর বার্তার অর্থ এই নয় যে ট্রাম্প ও ইসরায়েলের কৌশলগত সম্পর্ক এখনই পুরোপুরি ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। মূলত আসন্ন মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি আলোচনার টেবিলে ইসরায়েলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতেই হয়তো ওয়াশিংটন চাপের এই নতুন কূটনীতি ও কৌশল অবলম্বন করছে। কিন্তু ট্রাম্প এবং ভ্যান্সের মুখে মিত্র দেশের প্রতি এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করাটাই গত কয়েক দশকের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তা ও নতুন মেরুকরণের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।