MD ANIS | Times News 24 | Fast Online News Portal | শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
দীর্ঘ চার মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী সামরিক ও অর্থনৈতিক সংঘাতের পর অবশেষে যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ এবং স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বাঁ-এ অনুষ্ঠিত জি৭ (G7) শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ইলেকট্রনিক মাধ্যমে এই নথিতে সই করেন। হোয়াইট হাউস ও ট্রাম্প প্রশাসন এই চুক্তিটিকে সম্পূর্ণ ‘কর্মসম্পাদন বা পারফর্ম্যান্সভিত্তিক’ (Performance-based) হিসেবে বর্ণনা করেছে; অর্থাৎ ইরান তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করলেই কেবল এই চুক্তির সুবিধা ও আন্তর্জাতিক ছাড়গুলো ভোগ করতে পারবে। বহুল আলোচিত এই সমঝোতা স্মারকের মূল ১৪টি দফায় বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতির যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, তা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা লেবাননসহ 'সব ফ্রন্টে' সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ করবে। কোনো পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু বা হুমকি দিতে পারবে না এবং লেবাননের ‘ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব’ নিশ্চিত করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করবে এবং একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বা রাজনৈতিক বিষয়ে যেকোনো ধরণের হস্তক্ষেপে বিরত থাকবে।
সমঝোতা স্মারক সইয়ের দিন থেকে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে দুই পক্ষকে একটি চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা শেষ করতে হবে। হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে, বুধবার রাতে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে জি৭ সম্মেলন পরবর্তী নৈশভোজে ডোনাল্ড ট্রাম্প এতে স্বাক্ষর করার পর থেকেই এই সময় গণনা শুরু হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে আরোপিত তীব্র নৌ অবরোধ এবং সব ধরণের প্রতিবন্ধকতা সম্পূর্ণ অপসারণ করবে। এছাড়া চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র 'ইরানের নিকটবর্তী অঞ্চল' থেকে নিজেদের সামরিক বাহিনী সরিয়ে সংঘাত শুরুর আগের অবস্থানে (২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) ফিরে যাবে।
যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছিল। নতুন চুক্তি অনুযায়ী, ইরান সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে কোনো ধরনের ফি বা শুল্ক ছাড়াই হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল অবিলম্বে নিশ্চিত করবে। মাইন অপসারণ কার্যক্রম শেষেই এই রুট খুলে দেওয়া হবে।
ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন (৩০ হাজার কোটি) ডলারের একটি পারস্পরিক সম্মত আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। তবে এতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অর্থায়ন বাধ্যতামূলক নয়; বরং মার্কিন প্রশাসন এর জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও অনুমোদন দেবে, যাতে আঞ্চলিক অংশীদাররা (যেমন: আরব আমিরাত) ইরানে বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারে।
চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত সকল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে। এর মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের আওতায় থাকা নিষেধাজ্ঞা এবং ওয়াশিংটনের একতরফাভাবে আরোপিত 'অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি' কর্মসূচির সমস্ত আর্থিক বিধিনিষেধ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ইরান এই চুক্তির অধীনে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা অর্জন না করার ব্যাপারে শক্ত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তেহরানের মজুত থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের তীব্রতা আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ (IAEA)-এর তত্ত্বাবধানে 'ডাউনব্লেন্ড' বা হ্রাস করা হবে।
পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে পরবর্তী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত উভয় দেশ একটি 'স্থিতাবস্থা' (Status quo) বজায় রাখবে। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবে না এবং ইরানের তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানি ও ব্যাংকিং লেনদেনের জন্য বিশেষ ছাড়পত্র (Waiver) জারি রাখবে।
ইরানের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে এই দফায় বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী জব্দ বা আটকে রাখা সব ইরানি অর্থ সম্পূর্ণভাবে ব্যবহারের সুযোগ করে দেবে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের শর্ত মানার ওপর ভিত্তি করে পর্যায়ক্রমে এই সম্পদ মুক্ত করা হবে।
চুক্তির শেষ তিনটি দফায় বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো সঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি যৌথ 'তদারকি ব্যবস্থা' গঠন করা হবে। এমওইউ বাস্তবায়নের সাথে সাথেই দুই দেশ চূড়ান্ত চুক্তির আনুষ্ঠানিক এজেন্ডা শুরু করবে এবং সবশেষে এই চূড়ান্ত চুক্তিটি 'জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ'-এর একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদিত হবে।